একবিংশ শতাব্দীর বৃহৎ প্রতিযোগিতাপূর্ণ চাকরির বাজারে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনই কি যথেষ্ট? নাকি প্রয়োজন এমন কিছু বাস্তবমুখী দক্ষতা, যা একজন তরুণকে চাকরির বাজারে হাজার ভিড়ের মধ্যেও করে তুলবে অনন্য! তরুণদের মনের এই দোলাচলের অবসান ঘটাতে এবং ভবিষ্যৎ পথকে আরও মসৃণ করতে প্রথম আলো বন্ধুসভার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো ‘সিভি রাইটিং, লিংকডইন এবং ক্যারিয়ার গ্রোথ’–বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা।
ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সহযোগিতায় ১৯ জুন রাজধানীর কারওয়ান বাজার প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষে এটি অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল চারটা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত চলা এই কর্মশালা মুখরিত ছিল তরুণদের জানার আগ্রহ আর শেখার উদ্দীপনায়। এতে নিবন্ধনের মাধ্যমে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ২৮টি বন্ধুসভার ৮০ জন বন্ধু অংশগ্রহণ করেন।
ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার দপ্তর সম্পাদক তৌহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় শুরুতেই সিভি রাইটিং নিয়ে আলোচনা করেন বিডিজবস লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী ফিরোজ। তিনি তরুণদের মনে করিয়ে দেন যে চাকরির বাজারে একজন প্রার্থীকে অন্য দশজন থেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে একটি মানসম্মত সিভি কীভাবে এবং কতখানি ভূমিকা রাখে।
কর্মশালায় সেই কৌশলগুলো বিশদভাবে তুলে ধরে মোহাম্মদ আলী ফিরোজ বলেন, ‘সিভি শুধু আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতার তালিকা নয়, এটি আপনার পেশাগত পরিচয়ের প্রথম দরজা। নিয়োগকর্তা আপনার সঙ্গে কথা বলার আগেই আপনার সিভির সঙ্গে পরিচিত হন। তাই সামগ্রিক বিবরণীসহ, তথ্যসমৃদ্ধ এবং প্রাসঙ্গিক সিভি তৈরি করতে হবে, যা আপনার দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে তুলে ধরবে।’
মোহাম্মদ আলী ফিরোজ আরও বলেন, ‘চাকরির বাজারে ফ্রেশার মানেই অভিজ্ঞতাহীন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়টিকে কৌশলে ব্যবহার করতে পারলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীই নিজের জন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারবেন। বাংলাদেশে বর্তমানে সুযোগের অভাব নেই, আছে সচেতনতার ঘাটতি। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার আগেই যদি শিক্ষার্থীরা যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল স্কিল, ইন্টার্নশিপ, স্বেচ্ছাসেবী কাজ ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তাহলে চাকরির দৌড়ে তাঁরা অবশ্যই এগিয়ে থাকবেন।’
পেশাগত জীবনে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্র বা ক্যারিয়ার গ্রোথ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা শেয়ার করেন টেন মিনিট স্কুলের প্রোগ্রাম লিড ফারহান সাকিব। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ক্যারিয়ারে সফল হতে হলে সবার আগে নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। সেই সঙ্গে জীবনের প্রতিটি স্তরে নিয়মিত শেখার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
ক্যারিয়ার গ্রোথ নিয়ে ফারহান সাকিব বলেন, ‘ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; বরং প্রতিটি ব্যর্থতা আমাদের নতুন কিছু শেখায় এবং আরও পরিণত হতে সাহায্য করে। যারা চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করতে পারে, তারাই শেষ পর্যন্ত নিজেদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়।’
বর্তমান যুগ ডিজিটালাইজেশনের। এই যুগে নিজের দক্ষতা ও কাজের প্রচার করার অন্যতম সেরা মাধ্যম নিয়ে কথা বলেন ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন প্রফেশনাল এবং শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির লেকচারার সামসুদ্দোহা সাফায়াত। লিংকডইন ও পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের খুঁটিনাটি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে অনলাইন উপস্থিতিই অনেক সময় আপনার পরিচয় বহন করে। লিংকডইন শুধু চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি নিজের দক্ষতা, ব্যক্তিগত অর্জন ও চিন্তাভাবনা তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং বা পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে নিজেকে অন্যদের কাছে আলাদা ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব, যা ভবিষ্যতের যেকোনো বড় সুযোগ তৈরিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী কর্মশালা আয়োজনের পেছনের গল্প ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন মহানগর বন্ধুসভার প্রশিক্ষণ সম্পাদক আকিফ বিন সাঈদ। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, ক্যারিয়ার গঠনের জন্য প্রয়োজন বাস্তবমুখী দক্ষতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই চিন্তা থেকেই এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। আমরা চেয়েছি অংশগ্রহণকারীরা যেন সিভি রাইটিং, লিংকডইন ব্যবহার, পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে হাতে-কলমে ধারণা লাভ করতে পারে। বন্ধুদের মধ্যে শেখার আগ্রহ এবং নিজেদের উন্নত করার যে তাগিদ দেখেছি, তা আশাব্যঞ্জক।’
সমাপনী বক্তব্যে মহানগর বন্ধুসভার সভাপতি হাসান মাহমুদ সম্রাট উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘একটি সুন্দর ও ফলপ্রসূ আয়োজন সফল করার পেছনে সবার আন্তরিক অংশগ্রহণ এবং সহযোগিতা সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। আজকের এই কর্মশালায় উপস্থিত বন্ধুদের উৎসাহ, জানার আগ্রহ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, সিভি রাইটিং, লিংকডইন, পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং ও ক্যারিয়ার গ্রোথ বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান তাঁদের ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
কর্মশালা শেষে অংশগ্রহণকারী সবাইকে সনদ দেওয়া হয়।
সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা