‘অ আ ক খ' অক্ষরগুলোর মধ্যেই কি লুকিয়ে আছে আমাদের শিকড় ও ইতিহাস? ভাষা কি শুধু কথা বলার মাধ্যম, নাকি মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর পরিচয়?
এমনই কৌতূহল নিয়ে ৭ ফেব্রুয়ারি সকালে নোয়াখালীর মাইজদী বালিকা বিদ্যানিকেতন প্রাঙ্গণে জড়ো হয় শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতাধিক শিক্ষার্থী। সবার লক্ষ্য ভাষার মাসে নোয়াখালী বন্ধুসভার ১১তম বর্ণমালা উৎসবে অংশ নেওয়া। সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে ভাষা, সৃজনশীলতা ও উচ্ছ্বাসে ভরা এই উৎসব। আয়োজন সহযোগী হিসেবে ছিল এসো গড়ি উন্নয়ন সংস্থা ও একাডেমিক সহযোগী শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম 'ঘরের ইশকুল'।
ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন মাইজদী বালিকা বিদ্যানিকেতনের সহকারী প্রধান শিক্ষক ইসমাইল হোসেন। উদ্বোধন ঘোষণা করেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল কাইয়ূম মাসুদ। তিনি বলেন, বর্ণমালা উৎসব শিশুদের মধ্যে শুদ্ধ বাংলাচর্চা, কল্পনাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলার এক আনন্দময় উদ্যোগ।
প্রথম পর্বে অনুষ্ঠিত হয় লিখিত পরীক্ষা। তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা দুই বিভাগে ভাগ হয়ে বাংলা ভাষা, বর্ণমালা ও বাংলা পাঠ্যবইয়ের ওপরে পরীক্ষায় অংশ নেয়। বর্ণমালা প্রদর্শনীতে শিক্ষার্থীরা অপচনযোগ্য নানা বস্তু দিয়ে তৈরি করে আনে রঙিন বর্ণ। কোথাও কাগজ, কোথাও পাতা, কোথাও ফেলে দেওয়া উপকরণ দিয়ে বিভিন্ন বর্ণ সাজিয়ে আনে তারা।
পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয় অডিটোরিয়ামে। প্রশ্নোত্তর পর্বে তাদের সরল কিন্তু গভীর প্রশ্নে মুহূর্তেই জমে ওঠে আয়োজন। অতিথিরা উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি বাংলা ভাষার ইতিহাস, অনুভূতি ও ভাষাচর্চা নিয়েও কথা বলেন। দারুণ দারুণ প্রশ্ন করে তাৎক্ষণিক পুরস্কার জিতে নেওয়ার আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীরা। ছিল তাত্ক্ষণিক কুইজ পর্ব। সঠিক উত্তর দিয়ে অনেকেই গল্পের বই, কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা জিতে নেয়।
সাংস্কৃতিক পর্বে নোয়াখালী জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী বায়েজীদ ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানটি পরিবেশন করে সবাইকে মুগ্ধ করে। ‘যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তি সেনা’ গানটি পরিবেশন করে কল্যাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নীলাক্ষী মজুমদার।
দুপুর ১২টায় শুরু হয় ফলাফল ঘোষণা ও পুরস্কার বিতরণী পর্ব। উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক মাহবুবুর রহমান, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল কাইয়ূম মাসুদ, নোয়াখালী জিলা স্কুলের সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক মাহফুজের রহমান, প্রভাতি শিশু শিক্ষা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লায়লা তারেক, এন লিটল স্টার কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক লায়লা পারভীন, নোয়াখালী বন্ধুসভার উপদেষ্টা সুমন নূর ও কামাল হোসেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মাহবুবুর রহমান বলেন, 'বাংলা ভাষা আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, যা ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগে অর্জিত। বর্ণমালা উৎসব তোমাদের সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় এবং ভাষার প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে।'
মাহফুজের রহমান বলেন, ‘বন্ধুসভার বন্ধুরা আন্তরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে এই আয়োজন সম্পন্ন করেছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন ও রমজানের কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যেই এমন সুন্দর আয়োজন করা সত্যিই প্রশংসনীয়। বন্ধুসভার বন্ধুরা সব সময় জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত থাকে—তোমরাও বড় হয়ে তাদের সঙ্গে যুক্ত হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
লায়লা পারভীন অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, ‘সবাই সন্তানদের বেশি বেশি গল্পের বই পড়তে দেবেন। বেশি বেশি বই পড়লে তাদের চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পাবে। বন্ধুসভার প্রতিটি উপহারের সঙ্গে বই থাকে। আমরা সবাইও কাউকে উপহার দিতে বইকে প্রাধান্য দেব।’
লায়লা তারেক বলেন, ‘আমি অসুস্থতার মধ্যেও বর্ণমালা উৎসবে এসেছি। এখানে এসে তোমাদের দেখে শক্তি ফিরে পাচ্ছি। নোয়াখালীতে বন্ধুসভা ছাড়া এ ধরনের আয়োজন আর কেউ করে না।’
সুমন নূর বলেন, ‘আমরা অনেকেই শুদ্ধ করে বাংলা বলতে বা লিখতে পারি না। একটু সচেতন হলেই কিন্তু আমাদের ছোটখাটো বাংলার ভুলগুলো কেটে যাবে।’
শেষে ফলাফল ঘোষণা করেন নোয়াখালী বন্ধুসভার উপদেষ্টা কামাল হোসেন। অতিথিরা বিজয়ীদের হাতে স্মারক, সনদ, বই ও কিশোর আলো ম্যাগাজিন তুলে দেন।
‘ক বিভাগ’ লিখিত পরীক্ষায় বিজয়ী হয় কল্যাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আসফিয়া তাবাচ্ছুম ও নীলাক্ষী মজুমদার, চাইল্ড কেয়ার কিন্ডারগার্টেনের আশরাফুল আজিম, পুলিশ কেজি স্কুলের সাফওয়ান আহম্মেদ, হরিনারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আতিফা আলিস।
‘ক বিভাগ’ বর্ণ প্রদর্শনীতে বিজয়ী হয় চাইল্ডকেয়ার কিন্ডারগার্টেনের তাহিয়াত মাহমুদ, প্রভাতী শিশু শিক্ষাবিদ্যালয়ের জাহিন উদ্দিন, কল্যাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তাসফিয়া তাবাচ্ছুম, এন লিটল স্টার কিন্ডারগার্টেনের আব্দুল শাহরিয়ার, লক্ষ্মীনারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রেদওয়ানুল ইসলাম।
‘খ বিভাগ’ লিখিত পরীক্ষায় বিজয়ী হয় নোয়াখালী জিলা স্কুলের রিয়াজুল জান্নাত হক, হরিনারায়ণপুর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের তালহা জুবায়ের, নোয়াখালী জিলা স্কুলের নাজমুল ইসলাম, মাইজদী বালিকা বিদ্যানিকেতনের নুসরাত জাহান, অপরা পাল ও ফাতিমা লাবিবা।
‘খ বিভাগ’ বর্ণমালা প্রদর্শনীতে বিজয়ী হয় পুরো কল্যাণ উচ্চবিদ্যালয়ের আর্জু মনোয়া, নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের রোদুলা খানম, মাইজদী বালিকা বিদ্যানিকেতনের নুসরাত জাহান, রাজেসমিতা মজুমদার, হরিনারায়ণপুর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের মাহাদিদ হোসেন।
সভাপতি, নোয়াখালী বন্ধুসভা