কুয়াশাভেজা ভোরে হিমেল বাতাসের ঝাপটা। সেই শীত ছাপিয়ে তারুণ্যের উষ্ণতায় মুখর হয়ে উঠল স্নিগ্ধ সকাল। শীতের আবাহন আর নতুন স্বপ্নের সারথি হতে এক বর্ণিল মিলনমেলায় মেতে ওঠেন একঝাঁক প্রাণোচ্ছল তরুণ। ১৬ জানুয়ারি সকালে জেলা শহরের সেতুলী বেম্বো গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয় জামালপুর বন্ধুসভার ‘হিম উৎসব ২০২৬’। গান, আড্ডা আর পিঠার সুবাসে দিনটি বন্ধুদের জন্য হয়ে ওঠে এক স্মৃতিময় আনন্দের উৎসবে।
সকাল সাড়ে ৮টায় উৎসবের সূচনা হয় পিঠা উৎসবের মধ্য দিয়ে। কনকনে শীতে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম ভাপা আর চিতই পিঠার পাশাপাশি বন্ধুদের ঘর থেকে তৈরি করে আনা নকশি পিঠার পসরা যেন এক টুকরো গ্রামীণ আবহের সৃষ্টি করে। কুয়াশাঢাকা প্রকৃতির মাঝে পিঠার স্বাদ নিতে নিতেই জমে ওঠে বন্ধুত্বের দীর্ঘ আড্ডা।
আনুষ্ঠানিক পর্বে গত এক বছরের পথচলা ও সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন ২০২৫ কমিটির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রুবেল হাসান। এরপরই ২০২৫ কমিটির বিলুপ্তি ঘোষণা করে ২০২৬ সালের নতুন কমিটির সদস্যদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। নতুন প্রাণের স্পন্দনে অভিনন্দনপত্র ও ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেওয়া হয় আগামীর কান্ডারিদের। নবনির্বাচিত সভাপতি অন্তরা চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম খান তাঁদের বক্তব্যে মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সংগঠনকে আরও গতিশীল করার প্রতিশ্রুতি দেন।
অনুষ্ঠানে বরণ করে নেওয়া হয় উপদেষ্টাদের। সস্ত্রীক উপস্থিত হয়ে আয়োজনের আনন্দ বাড়িয়ে দেন উপদেষ্টা নাজমুল হাসান। অন্য উপদেষ্টারা তাঁদের বক্তব্যে নতুন কমিটিকে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেন এবং সংগঠন নিয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
উপদেষ্টা রাশেদুল ইসলাম দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে উৎসবে যোগ দেন। তিনি বলেন, ‘আমার এই ছেলেমেয়েরা গত এক বছরে এত আনন্দ করেনি, আজকে হিম উৎসবে এসে যতটা করেছে। শিশুদের এমন নির্মল আনন্দের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য জামালপুর বন্ধুসভার প্রতি কৃতজ্ঞ।’
উপদেষ্টা মোজাহিদুর রহমান নারী নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, ‘এবারের কমিটির সভাপতি একজন নারী, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’
উপদেষ্টা হিশাম আল মহান্নাভ পাঠচক্রের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘বন্ধুসভার কার্যক্রমের মধ্যে পাঠচক্র আমার সবচেয়ে প্রিয়। বর্তমান ডিজিটাল ডিভাইসের যুগে বই নিয়ে আলোচনা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে; তবে বন্ধুসভা এই কঠিন কাজটি নিয়মিত করে যাচ্ছে, যা প্রশংসার দাবিদার।’
সংগঠনের কাজে নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। ২০২৫ সালের কাজের ভিত্তিতে নুসরাত ইসলাম ‘সেরা বন্ধু’ এবং মো. বাকিবিল্লাহ্ ‘উদ্যমী বন্ধু’ হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁদের হাতে স্মারক এবং বিদায়ী সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রুবেল হাসানের হাতে বিশেষ অভিনন্দন স্মারক তুলে দেন উপদেষ্টারা।
প্রথম আলোর জামালপুর প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ বলেন, ‘জামালপুর বন্ধুসভা প্রতিবছর কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরা দশে জায়গা করে নেয়। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সমাজ সংস্কার ও দেশ গঠনে বন্ধুদের বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।’
উৎসবের দ্বিতীয় ভাগে হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। কবিতা আবৃত্তি, কৌতুক, গান আর নৃত্যের তালে মেতে ওঠেন সবাই। বিশেষ আকর্ষণ ছিল রম্য বিতর্ক, যা যুক্তিতর্ক আর কৌতুকের ছলে সামাজিক বিভিন্ন দিক তুলে ধরে দর্শকদের মুগ্ধ করে। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম।
দিনভর আনন্দ-উচ্ছ্বাস শেষে অনুষ্ঠিত হয় র্যাফল ড্র। পুরস্কার জিতে নেন নাইমুল শাকিল, রিফাত ও সিফাত আব্দুল্লাহ্। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার মাধ্যমে উৎসবের ইতি ঘটে।
উপদেষ্টা, জামালপুর বন্ধুসভা