শীত মৌসুমে ঝরাপাতার মৃদু গুঞ্জন আর অতিথি পাখির নিভৃত বিচরণে জাহাঙ্গীরনগর যেন এক স্বপ্নলোক। এমন সময়ে কুয়াশায় মোড়ানো সন্ধ্যা, রঙিন আলোকসজ্জা, ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির ঘ্রাণ আর সাংস্কৃতিক আবেশ ক্যাম্পাসে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করে। ১৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম ছায়ামঞ্চ প্রাঙ্গণে ঠিক এমনই পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল।
জাবি বন্ধুসভার ‘কুয়াশা উৎসব ২০২৬’–এ অংশ নিয়ে সেই মায়াবী পরিবেশের সঙ্গে মিশে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বন্ধুসভার বন্ধুরা। ‘মেঘের চাদরে ঐতিহ্যের আদরে, কুয়াশা উৎসব ভাসে প্রাণের জোয়ারে’ প্রতিপাদ্যে এই উৎসব ক্যাম্পাসজুড়ে প্রাণের জোয়ার বয়ে আনে।
সন্ধ্যা নামতেই লাল-নীল আলোয় সেজে ওঠে ছায়ামঞ্চ প্রাঙ্গণ। সাজসজ্জায় ছিল বাঙালিয়ানার নান্দনিক ছোঁয়া—মাটির হাঁড়ির আলোয় আলোকিত ফটোবুথ, বেতের কারুকার্যময় মঞ্চসজ্জা ও গ্রামীণ নকশার অলংকরণ যেন লোকজ ঐতিহ্যের আবহ তৈরি করে।
পুরো আয়োজনই ছিল বাঙালি সংস্কৃতি, মাটি ও শিকড়ের এক প্রাণবন্ত উদ্যাপন। চারপাশে বসার ব্যবস্থা, রকমারি খাবারের স্টল, পিঠা, নাশতা, পানীয় এবং নান্দনিক জুয়েলারি স্টল উৎসবে বাড়তি রং যোগ করে। শীতের আমেজে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি–মাংস ছিল বিশেষ আকর্ষণ। ফেস পেইন্টিংয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করেন।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক বলেন, ‘বন্ধুসভা হৃদয়ের খুব কাছের সংগঠন। দেশজুড়ে বন্ধুদের কার্যক্রম অসংখ্য মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। জাবি বন্ধুসভার নিয়মিত কার্যক্রম, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও মিলনের প্রচেষ্টাই একে সেরা করে তুলেছে। এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।’
জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী সভাপতি ফরহাদ হোসেন মল্লিক, সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি এবং ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সভাপতি হাসান মাহমুদ সম্রাট, সাধারণ সম্পাদক অনিক সরকারসহ জাবি বন্ধুসভার বিদায়ী কমিটির সদস্যরা তাঁদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সোহেল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘জাবি বন্ধুসভা ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশে যেন সুনাম অর্জন করে। সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে জাহাঙ্গীরনগরের যে সুনাম, সেটি যেন এবারের কুয়াশা উৎসবের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো।’
অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ মো. আবদুর রব, প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম, জাকসু ভিপি আবদুর রশিদ জিতুসহ অনেকেই।
সাংস্কৃতিক পর্বে গান ও নাচ পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলে। দর্শকদের উদ্দীপনা, করতালি আর উচ্ছ্বাসে মুখর ছিল প্রাঙ্গণ। সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় র্যাফল ড্র। প্রথম পুরস্কার ছিল ঢাকা–কক্সবাজার–ঢাকা এয়ার টিকিট, যা উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ছিল জাবি বন্ধুসভার কার্যনির্বাহী কমিটির দায়িত্ব হস্তান্তর পর্ব। বিদায়ী সভাপতি শেখ হামিম ও সাধারণ সম্পাদক রেজনান চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সভাপতি সৈয়দ সালমান হাসান ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আনোয়ার হোসেন।
কুয়াশা উৎসব ২০২৬–এ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে ছিল আরভিন্দ গ্রুপ, লজিস্টিকস পার্টনার মিডিয়া মিক্স কমিউনিকেশনস, এয়ারলাইনস পার্টনার ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনস এবং বেভারেজ পার্টনার সজীব গ্রুপ।
শীতের কুয়াশা, বন্ধুত্বের উষ্ণতা আর সাংস্কৃতিক আবেশে ভরপুর এই আয়োজন শুধু একটি উৎসব নয়, এটি ছিল বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও তারুণ্যের মিলনমেলা। কুয়াশা উৎসব ২০২৬ তাই জাবির স্মৃতিতে এক রঙিন অধ্যায় হয়ে থাকবে।
প্রচার সম্পাদক, জাবি বন্ধুসভা