সহমর্মিতার ঈদ
বন্ধুসভার ঈদ উপহারে দেশব্যাপী আনন্দ
নিজেদের ঈদের কেনাকাটা থেকে সঞ্চয় করা অর্থের সঙ্গে উপদেষ্টা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিতজনদের সহায়তা যোগ করে দেশ-বিদেশের ৮৬টি বন্ধুসভা স্বেচ্ছাসেবায় বাস্তবায়ন করেছে ‘সহমর্মিতার ঈদ' কর্মসূচি। উদ্যোগটির আওতায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য নতুন পোশাক প্রদান, মেহেদি উৎসবের আয়োজন এবং তাদের পরিবারের জন্য খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদায় কয়েকজনকে চিকিৎসা-সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
‘আমার একটা নতুন জামা হইবো, এইডা ভাবতেই পারি নাই। ঈদের দিন এইডা পইরা ঘুরতে যামু।' লাজুক হেসে কথাগুলো বলছিল ১০ বছরের রায়হান। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার ছোট বোন তানিয়া নতুন ফ্রকটা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এইডা আমার খুব পছন্দ হইছে।'
শুধু রায়হান বা তানিয়াই নয়, দেশের নানা প্রান্তে এমন অসংখ্য শিশুর মন এবার ঈদের আগে নতুন পোশাক পেয়ে খুশিতে ভরে উঠেছে। কারও চোখে বিস্ময়, কারও মুখে হাসি, আবার কারও কণ্ঠে কৃতজ্ঞতার সরল উচ্চারণ—সব মিলিয়ে যেন এক অন্য রকম আনন্দের ছবি।
বরিশালের এক নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু সুমাইয়া নতুন জামা পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলছিল, 'মা, এইবার আমিও ঈদে নতুন জামা পরতে পারব।' অন্যদিকে শেরপুরের এক বৃদ্ধা রহিমা বেগম খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেট হাতে নিয়ে বলেন, ‘এইগুলা পাইয়া অন্তত ঈদের দিন পোলাপান লইয়া ভালোভাবে খাইতে পারমু।'
এভাবেই সারা দেশে প্রথম আলো বন্ধুসভার ‘সহমর্মিতার ঈদ’ কর্মসূচির মাধ্যমে অসংখ্য শিশুর মুখে হাসি আর তাদের পরিবারে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে এবারের ঈদ। জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের আহ্বানে দেশ ও দেশের বাইরের বন্ধুসভাগুলো নিজেদের উদ্যোগে, স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। নিজেদের ঈদের কেনাকাটার টাকা থেকে সঞ্চয়, উপদেষ্টা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিতজনদের সহায়তায় মোট ৪ হাজার ১০৫ জন শিশুর হাতে নতুন পোশাক এবং ৪ হাজার ৪৪৩টি পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ ৬১ হাজার ৬৪৭ টাকার উপহার ও সহায়তা প্রদান করেন বন্ধুসভার বন্ধুরা।
শুধু উপহার নয়, অনেক জায়গায় আয়োজন করা হয়েছে মেহেদি উৎসব, শিশুদের জন্য ঈদ সালামি, এমনকি অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এ উদ্যোগ সম্পর্কে প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও বন্ধুসভার পৃষ্ঠপোষক আনিসুল হক বলেন, সহমর্মিতার ঈদ শুধু একটি কর্মসূচি নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেও অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর এই প্রচেষ্টা সত্যিই অনন্য।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্ধুসভার বন্ধুরা নিজেদের মতো করে এই আনন্দ ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোথাও নদীতীরের ঝুপড়িতে, কোথাও শহরের বস্তিতে, আবার কোথাও প্রান্তিক গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মধ্যে পৌঁছে গেছে ঈদের উপহার। অনেক বন্ধুসভা খুঁজে খুঁজে এমন মানুষদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে, যাদের কাছে এই উপহারই ছিল ঈদের একমাত্র আনন্দ। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, অসুস্থ মানুষ কিংবা কর্মহীন পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুরা দেখিয়েছেন মানবিকতার আরেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কারও জন্য হুইলচেয়ার, কারও জন্য ওষুধ, আবার কারও জন্য একমুঠো খাদ্য– সব মিলিয়ে এ উদ্যোগ ছড়িয়ে দিয়েছে ভালোবাসা আর সহমর্মিতার বার্তা।
বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক বলেন, ‘“সহমর্মিতার ঈদ” বন্ধুসভার বন্ধুদের নিজেদের উদ্যোগ হলেও এখন এতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে। এ বছরও শামসুল আলম নাদিম এক লাখ টাকা এবং জাতীয় পর্ষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বুশরার মাধ্যমে ৭০ হাজার টাকা এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাস নেটওয়ার্কের সৌজন্যে জাতীয় পর্ষদের মাধ্যমে ৭৫ জনকে পোশাক ও ঈদ খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, বন্ধুরা নিজেরাই শুধু নন, সারা দেশে বিভিন্নজনের মধ্যেও এই সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে গেছে। এটাই আমাদের আনন্দ। আর এই আনন্দের অংশীদার সারা দেশের সব বন্ধুসভার প্রত্যেক বন্ধু ও সুহৃদ।'
দেশব্যাপী এই কার্যক্রমে এবার মূল সমন্বয়ক হিসেবে ছিলেন জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আশফাকুর রহমান আদি। বিভাগীয় সমন্বয় হিসেবে কাজ করেছেন মাহমুদা বুশরা, নাফিউর নূর, তাপসী রায়, নাঈমা সুলতানা, রাজা মান্নান তালুকদার, আকিফ বিন সাঈদ, তানভীর হাসান, মেঘা খেতান ও মৌরি বিনতে আজাদ। জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সারা দেশের বন্ধুরা সম্মিলিতভাবে এই আয়োজন সফল করেছেন।
ঈদের আনন্দ যখন অনেকের জন্য সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন বন্ধুসভার এই উদ্যোগ সেই আনন্দকে ছড়িয়ে দেয় সবার মধ্যে। একটি নতুন জামা, একব্যাগ খাদ্যসামগ্রী কিংবা সামান্য সহায়তা—সবকিছু মিলেই তৈরি হয় সুখের গল্প। অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, সামান্য উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বন্ধুসভার বন্ধুদের এই ভালোবাসা আর সহমর্মিতা ভবিষ্যতেও ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রতিটি প্রান্তে।
যেসব বন্ধুসভা সহমর্মিতার ঈদ বাস্তবায়ন করেছে-
জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ, ঢাকা মহানগর, রাউজান, কাতার, কক্সবাজার, মাদারীপুর, সিলেট, লালমনিরহাট, ঝালকাঠি, ঠাকুরগাঁও, ভৈরব, কেশবপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, মাগুরা, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, রংপুর, নালিতাবাড়ী, কুমিল্লা, কয়রা, শরীয়তপুর, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নীলফামারী, রাজবাড়ী, বগুড়া, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, মোংলা, রায়গঞ্জ, দয়ালনগর, পঞ্চগড়, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল, সাভার, সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, পাবনা, ঢাবি লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং, চকরিয়া, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, মুরারিচাঁদ কলেজ, ফেনী, পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, কুষ্টিয়া, রাঙ্গুনিয়া, দিনাজপুর, সুনামগঞ্জ, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, চাঁদপুর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নড়াইল, গাইবান্ধা, যশোর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা, রাঙামাটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পাবনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পটিয়া, ফরিদপুর, কেরানীগঞ্জ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর, কলাপাড়া, বরগুনা, পটুয়াখালী, ও শেরপুর।