নারীদের লড়াই উদ্‌যাপন করতে হবে

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে 'নারীর সুরক্ষা ও নিরাপদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম' শিরোনামে প্রথম আলো বন্ধুসভার বিশেষ আলোচনা সভা। ৮ মার্চ, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ের সভাকক্ষেছবি: খালেদ সরকার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এই ভার্চ্যুয়াল জগতে নারীরা প্রায়ই সাইবার বুলিং, হেনস্তা ও নানা ধরনের আক্রমণের শিকার হন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সচেতনতা, মানসিক প্রস্তুতি ও পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তন। একই সঙ্গে নারীদের সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদ করতে হবে এবং নারী-পুরুষ সবাইকে মিলে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে 'নারীর সুরক্ষা ও নিরাপদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম' শিরোনামে প্রথম আলো বন্ধুসভার বিশেষ আলোচনা সভায় এ কথা বলেন অতিথিরা। ৮ মার্চ বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ের সভাকক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ। অনুষ্ঠানে নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত 'জাতীয় নারী বারোয়ারি বিতর্ক প্রতিযোগিতা ২০২৬'-এর ফল ঘোষণা ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়। ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বন্ধুসভার বন্ধুরা এতে অংশ নেন।

মানবাধিকারকর্মী ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার ইলিরা দেওয়ান, এবং প্রথম আলোর ইংরেজি বিভাগের সম্পাদক আয়েশা কবির।

বিকেল ৪টায় বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সভাপতি জাফর সাদিক। তিনি উপস্থিত সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানান এবং নারীদের জন্য নিরাপদ ও ইতিবাচক বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

মূল আলোচনায় অংশ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার ইলিরা দেওয়ান বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপদ থাকার বার্তা বন্ধুসভার মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বেশি করে ছড়িয়ে দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের আইসিটি বইয়ে শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে তাদের আরও প্রস্তুত করে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তারা অনলাইনে হেনস্তার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে। পাশাপাশি মা-বাবাদেরও সচেতন থাকা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা দিকনির্দেশনা পেতে পারে।'

লেখক ও যোগাযোগবিশেষজ্ঞ নিশাত সুলতানা, এবং রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক তাসনিম জারা।

প্রথম আলোর ইংরেজি বিভাগের সম্পাদক আয়েশা কবির জানান, বাংলাদেশের মতো পশ্চিমা বিশ্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী-শিশুদের একই সমস্যায় পড়তে হয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় অনেক দেশই ১৬ বছরের কমবয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেয়। কিন্তু অপরাধীরা ঠিকই অবাধে এই মাধ্যমগুলোয় বিচরণ করে। এটা সঠিক বিচার নয় উল্লেখ করে আয়েশা কবির আরও বলেন, এসব সত্ত্বেও নারীদের সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

যে যার জায়গা থেকে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে জানিয়ে লেখক ও যোগাযোগবিশেষজ্ঞ নিশাত সুলতানা বলেন, 'বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও আমাদের আজ সমতার কথা বলতে হচ্ছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। আজ যদি আমরা নারীদের পাশে না দাঁড়াই, সেটার কিন্তু ফল ভোগ করতে হবে সবার।'

সুবর্ণ প্রকাশনীর প্রকাশক শাহরিন হক ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী।

রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক তাসনিম জারা তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, 'জুলাই গণ- অভ্যুত্থানের সময় নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। নারীরা সামনের সারিতে ছিল। কিন্তু যতই দিন গেল, দেখলাম রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান সংকুচিত হচ্ছে। এর কারণ, রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডাররা এখনো তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী নারীদের সামনে আনছে, আবার সরিয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। রাজনীতিবিদ নারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হলে, তাঁরা এর সাথে কোনো না কোনোভাবে নিজেদের মানিয়ে নেন। কিন্তু এখানে যাঁকে উদ্দেশ করে আক্রমণ করা হচ্ছে, এর ভিকটিম শুধু সে নয়, বরং এই অঙ্গনের সব নারীই ভিকটিম। তাই সাইবার বুলিংয়ের কারণে নারীরা যদি চুপ হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের একটা সময় আর পাওয়া যাবে না। তাই চুপ থাকা যাবে না।'

চলচ্চিত্র অভিনেত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী বলেন, 'নারীরা যখন বুলিংয়ের শিকার হয়ে প্রতিবাদ করে কোনো পোস্ট করে, সেটার জন্যও বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। অবস্থা এমন যে সবাই ভিকটিমকেই দোষারোপ করে। এই সমস্যা মোকাবিলায় প্রত্যেক মা-বাবার উচিত তাঁর সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সচেতন করে গড়ে তোলা।' ঐশী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করা উচিত। কারণ, মানসিকভাবে সুস্থ কোনো মানুষ সাইবার বুলিং করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সবারই কাউন্সেলিং প্রয়োজন।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা আতিক স্মৃতি।

সুবর্ণ প্রকাশনীর প্রকাশক শাহরিন হক তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই প্রশ্ন তুলে বলেন, 'একজন মানুষ হিসেবে আমাদের কেন নারীর সুরক্ষা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে? কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে? কেন এই মাধ্যম অনিরাপদ? এই প্রশ্নগুলো আমরা কেন নিজেদের ভেতর চর্চা করছি না? ভাবনার জায়গাটা ছড়িয়ে দিতে হবে। আমাকে তো সৃষ্টিকর্তা দুর্বল করে তৈরি করেননি। তবু কেন সুরক্ষার বিষয়টি আসছে? আমাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতে হবে।'

শাহরিন হক আরও বলেন, 'কর্মক্ষেত্রে কারও আপা হিসেবে না, বরং একজন সহকর্মী হিসেবে যাতে সম্মানটা পাই। নারী দুর্বল না। পুরুষেরা যদি এমনটা ভেবে থাকে তাহলে এটা তাদের ভুল ধারণা। এই ধারণা পরিবর্তন করতে হবে।'

একেক অঙ্গনে নারীদের একেক ধরনের চ্যালেঞ্জ, উল্লেখ করে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, ‘নারীর লড়াইটাকে আমরা উদ্‌যাপন করতে চাই। এটা আমাদের সমাজের লড়াই। নারীদের লড়াইটাকে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখাতে চাই। আমরা যদি জনসংখ্যার এই অর্ধেক শক্তিকে (নারী) এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে সবাই মিলে কাজ করতে হবে।’

মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ মাহমুদা মুহসিনা বুশরা, এবং রেজুভা ওয়েলনেসের কনসালট্যান্ট ও ওয়েলনেস বিশেষজ্ঞ তাওহীদা রহমান ইরিন।

ডিজিটাল মাধ্যম বিষয়ে নারীদের শিক্ষিত হওয়ার ওপর জোর দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা আতিক স্মৃতি। তিনি বলেন, 'ডিজিটাল মাধ্যমের এই আক্রমণ কেবল বুলিং না, বরং নারীর আত্মপরিচয় ও মর্যাদায় আঘাত। নারীর এই সুরক্ষা নিজেই নিজেকে দিতে হবে। এ জন্য ডিজিটালি অনেক বেশি শিক্ষিত হতে হবে। ব্যক্তি হিসেবে নিরাপত্তার জায়গাটা থাকতে হবে। নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে কি না, এই প্রশ্ন তোলাটাও জরুরি। নারী-পুরুষ উভয়ের এই বিষয়টি বুঝতে হবে।’

নারীর সুরক্ষায় করণীয় নিয়ে কথা বলেন রেজুভা ওয়েলনেসের কনসালট্যান্ট ও ওয়েলনেস বিশেষজ্ঞ তাওহীদা রহমান ইরিন। মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ মাহমুদা মুহসিনা বুশরা বলেন, 'পরিবর্তন ঘটাতে হবে আমাদের চিন্তায়, আমাদের আচরণে। নারী-পুরুষ কেন আলাদা হবে? আমরা সবাই মানুষ।'

প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, 'আমরা নারী-পুরুষের সমতার জন্য লড়াই করছি। নারীর পাশে দাঁড়িয়ে পুরুষদেরও সমানভাবে এই লড়াইটা করে যেতে হবে।'

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নোয়াখালী বন্ধুসভার সনাতনী ও বারোয়ারি বিতর্ক প্রতিযোগিতা
ছবি: বন্ধুসভা

দেশজুড়ে নারীর অধিকার আদায়ে বন্ধুসভা

'সমতার পথে, যুক্তির লড়াই' প্রতিপাদ্যে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সনাতনী ও বারোয়ারি বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে নোয়াখালী বন্ধুসভা। ৮ মার্চ জেলা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এটি অনুষ্ঠিত হয়। 'গ্রামবাংলার নারীর উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়' বিষয়ে সনাতনী বিতর্কে অংশ নেয় নোয়াখালী সরকারি কলেজের দুটি বিতার্কিক দল। আর বারোয়ারি বিতর্কের বিষয় ছিল 'আমি যদি সমাজের আয়না হতাম...।'

বেগম রোকেয়ার বিখ্যাত গল্প 'সুলতানাস ড্রিম' নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা। গাজীপুর বন্ধুসভা আয়োজন করে ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভা।

'আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার' প্রতিপাদ্যে কক্সবাজার বন্ধুসভা আয়োজন করে আলোচনা সভা। যেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং বৈষম্যহীন নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বন্ধুরা।

নারীর শক্তি, সাহস ও প্রেরণাকে তুলে ধরতে প্রতীকী চিত্র অঙ্কন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার বন্ধুরা। বিভিন্ন অঙ্গনে নারীদের নেতৃত্ব, সফলতা, অভিজ্ঞতা, প্রতিবন্ধকতা ও নারীদের প্রতি বার্তা জানাতে ড্যাফোডিল বন্ধুসভা তৈরি করেছে ভিডিও তথ্যচিত্র।