বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম। প্রাচীন এই শহর বহু ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাক্ষী। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব মাতৃভাষা রয়েছে। যাকে বলা হয় ‘আঞ্চলিক ভাষা’। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা তার মধ্যে অন্যতম। আধুনিকতার এই যুগে সেই আঞ্চলিক ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে উৎসবের মাধ্যমে তুলে ধরতে ‘চাটগাঁইয়া উৎসব’ শিরোনামে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা।
১৮ অক্টোবর জেলা শিল্পকলা একাডেমির আর্ট গ্যালারিতে এটি অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গান, নাচ ও জাদু পরিবেশনা এবং কবিতা আবৃত্তি ছিল উৎসবের মূল আকর্ষণ।
সেদিন হেমন্তের বিকেলটি ছিল উৎসবের রঙে রঙিন। প্রকৃতির মৃদু স্নিগ্ধতা যেন বুঝতে দেয়নি শরতের বিদায়ের পর ফিরে এসেছে কার্তিক মাস। এই উৎসব যেমন ছিল একদিকে বন্ধুসভার নবীন-প্রবীণ বন্ধুদের পদচারণে মুখরিত, তেমনই শিল্পকলায় আসা দর্শকদের কৌতূহল ছিল চোখে পড়ার মতো। মূল পর্ব শুরু হয় আঞ্চলিক গান পরিবেশনার মাধ্যমে। বন্ধুদের দলীয় এই গানে ছিল ‘ও ভাই আঁরা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান’, ‘যদি সুন্দর’, ‘ওরে সাম্পানওয়ালা’, ‘মধু হই হই’, ‘ওরে কালা ভ্রমরা’, ‘বাঁশখালী মহেশখালী’-এর মতো বিখ্যাত সব গান।
কালের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া এই আঞ্চলিক গানগুলো সেদিনের উপস্থিত চাটগাঁইয়া দর্শকমহল বেশ ভালোভাবে উপভোগ করেন। গান পরিবেশনায় ছিলেন বন্ধু জয় চক্রবর্তী, স্বস্তিকা দাশ, নানজিবা মুনজারিন, মহিবুল আরিফ, তুষার কবির, রেদোয়ান আল হোসাইন ও ঝর্ণা। একক নৃত্য পরিবেশন করেন সর্ব কনিষ্ঠ বন্ধু অদ্বিতীয়া। ‘ছোট ছোট ঢেউ তুলি পানি’ আঞ্চলিক গানটির ছন্দে তার নাচ ছিল অনবদ্য। এরপর দ্বৈত গানের আসর। ‘ও জেডা, ফইরর বাপ’ গেয়ে আসর মাতিয়ে রাখেন বন্ধু মহিবুল আরিফ ও ঝর্ণা। একক পরিবেশনায় বন্ধু স্বস্তিকা দাশের সুমধুর কণ্ঠে ‘আঁরার চাটগাঁ হত সুন্দর’ গানটি যেন হৃদয় ছুঁয়ে যায় আর্ট গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের। ‘নাম ঠিকানা জানা নাই’ গানে দ্বৈত নাচে বন্ধু প্রান্তিকা ভৌমিক ও আশরাফুল কাদেরের পরিবেশনা দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়।
দ্বৈত গান পরিবেশন করেন বন্ধু স্বস্তিকা দাশ ও ঝর্ণা। তাঁরা গেয়ে শোনান ‘বাইন দুয়ার দি’। এরপর পরিবেশিত হয় দলীয় কবিতা আবৃত্তি। বন্ধু কামরান চৌধুরীর লেখা আঞ্চলিক কবিতা ‘আঁরার চট্টগ্রাম’ আবৃত্তি করেন বন্ধু বহিৃশিখা পর্ণা, কামরান চৌধুরী, নানজিবা মুনজারিন, আশরাফুল কাদের ও তুষার কবির। আবৃত্তি পরিবেশনার পর একক গান নিয়ে আসেন বন্ধু মহিবুল আরিফ। তাঁর গাওয়া ‘কালা বউ’ গানটি দর্শকরা ব্যাপক উপভোগ করেন। এরপর আবারও দ্বৈত গান। এই পর্বে বন্ধু স্বস্তিকা দাশ ও শাহাদাত হোসেন ‘আইজকাল আঁই আইলে’ গানটি পরিবেশনা করেন। দ্বৈত গানের আরেকটি পর্বে বন্ধু জয় চক্রবর্তী ও স্বস্তিকা দাশ চট্টগ্রামের বিখ্যাত ‘বাইক্কা টেঁয়া দে’ গানে উৎসব জমিয়ে তোলেন। দ্বৈত গানের পর একক নাচ পরিবেশন করেন বন্ধু স্বস্তিকা সেনগুপ্ত। ‘ও বানু, বানু রে’ নামক কালজয়ী গানে তিনি মুগ্ধতা ছড়ান।
নাচ, গান, আবৃত্তি অনেক হলো। তাহলে ‘জাদু’র কথা কেন বাদ যাবে। দশর্কদের কৌতূহলের আরেকটি পরিবেশনা ছিল বন্ধু জাদুশিল্পী ফয়সাল হাওলাদারের বিখ্যাত সব পরিবেশনা। এরপর আসে কোরাস গানে নাচ। ‘পেট ফুরেদ্দে তোঁয়ার লাই’ ও ‘কইলজার ভেতর গাঁথি রাইখখুম তোঁয়ারে’ নামক শ্রুতিমধুর এই গানে চমৎকার নাচ পরিবেশন করেন বন্ধু স্বস্তিকা দাশ, মাসুদ রানা, নানজিবা মুনজারিন ও সামিন। কোক স্টুডিওর বিখ্যাত ‘মুড়ির টিন’ পরিবেশন করেন বন্ধু জয় চক্রবর্তী, মহিবুল আরিফ, পৃথ্বিরাজ বড়ুয়া ও রেদোয়ান আল হাসান। গানটির বাধ্যযন্ত্রে ছিলেন বন্ধু অর্ণব মহাজনসহ অন্যান্য শিল্পী বন্ধুরা। অনুষ্ঠানের শেষ চমক ছিল ‘বিশেষ দ্বৈত নাচ’। মাসুদ রানা, নুরুজ্জামান খান, কামরান চৌধুরী ও আশরাফুল কাদেরের পরিবেশনায় আঞ্চলিক গান ‘সুরাইয়া’র ছন্দে তাঁদের নাচ উৎসবে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
উৎসবে চাটগাঁইয়া ভাষা ছিল দশর্কদের মুখে মুখে। নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে আগলে রাখার এই প্রয়াসকে অব্যাহত রাখার আহ্বান করেন উপদেষ্টা জসিম আহমেদ। আরও বক্তব্য দেন উপদেষ্টা জাকিয়া কবির, সভাপতি ইব্রাহিম তানভীর ও সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান খানসহ অন্যান্যরা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে মজার স্মৃতিচারণা করেন বন্ধু জয়শ্রী মজুমদার ও হৃদয় হাসান। সঞ্চালনা করেন উপদেষ্টা শিহাব জিসান ও স্বস্তিকা দাশ। আঞ্চলিকতার ভাষায় তাঁদের সঞ্চালনা ছিল প্রশংসনীয়। উৎসবের সমন্বয়ক হিসেবে ছিলেন বন্ধু রুমিলা বড়ুয়া, রিমি বিশ্বাস, ইশরাত জাহান, প্রান্তিকা ভৌমিক, বহিৃশিখা পর্ণা ও ফয়সাল হাওলাদার।
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা