উপস্থাপনা কি কেবল সুন্দর করে কথা বলা, নাকি সঙ্গে জড়িয়ে আছে গল্প বলার কৌশল, তথ্যের গভীরতা, আত্মবিশ্বাস আর শ্রোতাকে বোঝার ক্ষমতা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কেউ এসেছেন রংপুর থেকে, কেউ কক্সবাজার বা যশোর থেকে। তাঁদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপস্থাপনা করছেন, কেউ চাকরির ফাঁকে সংবাদ পড়ছেন, কেউ পড়াশোনা শেষে চাকরি খুঁজছেন। কারও স্বপ্ন টেলিভিশনের পর্দায় উপস্থাপনা করা, কারও লক্ষ্য মাইক্রোফোনের সামনে জড়তা কাটিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা। তবে সবার চাওয়া এক—নিজের উপস্থাপনা-দক্ষতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
এই লক্ষ্যে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে অনলাইনে চারটি সেশন শেষে বিশেষ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রায় তিন শ অংশগ্রহণকারীর মধ্য থেকে নির্বাচিত একদল তরুণ-তরুণী সারা দেশ থেকে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষে জড়ো হন।
তাঁদের জন্য স্মার্ট প্রেজেন্টেশন, শুদ্ধ উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি, সংবাদপাঠের কৌশল, ভ্লগ ও পডকাস্ট উপস্থাপনা, চাকরির সাক্ষাৎকার এবং উপস্থাপক পদের জন্য সিভি প্রস্তুত করাসহ উপস্থাপনার নানা দিক নিয়ে দিনব্যাপী আলোচনা করেন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের দেশসেরা সংবাদ ও অনুষ্ঠান উপস্থাপক এবং ভ্লগিং তারকারা। অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি শেখার ও নিজেদের দক্ষতা আরও ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান।
১০ অক্টোবর ‘প্রেজেন্টেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শিরোনামে যৌথভাবে এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে প্রথম আলো বন্ধুসভা ও অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটি (এবিসি)। সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আয়োজন।
জাতীয় পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টির সঞ্চালনায় পরিচিতি পর্বের পর স্বাগত বক্তব্য দেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সহসভাপতি রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী ও নূর ই আলম। প্রথম সেশনে ‘স্মার্ট প্রেজেন্টেশন’ বিষয়ে আলোচনা করেন যমুনা টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক ও অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির (এবিসি) মহাসচিব দেবাশীষ রঞ্জন সরকার। তিনি বলেন, ‘অডিয়েন্সকে জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। যে তথ্যটা দিচ্ছেন, সেটায় একটার সঙ্গে আরেকটার সংযোগ থাকতে হবে। যেখানেই উপস্থাপন করতে যাবেন, নিজের মধ্যে কোনো সংশয় রাখবেন না।’
বাংলাদেশ বেতারের জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক ফারজানা করিম উপস্থাপনায় উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গির কৌশল নিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন। তিনি শুরুতেই অংশগ্রহণকারীদের পাঁচজন করে দল ভাগ করে দেন। তারপর সড়ক দুর্ঘটনার একটি ঘটনা লেখান। দলের সদস্যরা সেই ঘটনা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সংবাদ আকারে উপস্থাপনের জন্য স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন। প্রতি গ্রুপ থেকে একজন উপস্থাপক হিসেবে সেই স্ক্রিপ্ট সংবাদ আকারে উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া তিনি নিউজরুমের মধ্যে কী কী থাকে, কী ঘটে, কীভাবে সংবাদের স্ক্রিপ্ট লেখা হয়—তথা নিউজরুম অপারেশন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
কর্মশালার মাঝে একফাঁকে উপস্থিত হন প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘উপস্থাপক হতে হলে অনেক জানতে হয়, শিখতে হয়। আমরা যাতে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে এসব বিষয় জেনে উপস্থাপনায় আরও ভালো করি, সে লক্ষ্যেই বন্ধুসভার এমন দারুণ আয়োজন।’
প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, ‘সুন্দর করে উপস্থাপন করা, সবার সঙ্গে কানেক্ট করা—এটা একটা বিশেষ শৈলী। বন্ধুসভা এগুলো নিয়ে কাজ করছে দেখে ভালো লাগছে।’
কর্মশালায় নিউজরুম অপারেশন বিষয়ে কথা বলেন স্টার নিউজের নির্বাহী প্রযোজক রাফিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘উপস্থাপকদের সাধারণ জ্ঞানের ওপর জোর দিতে হবে।’ ইন্টারভিউর প্রস্তুতি, ওই দিন কী কী হয়, সাজগোজ কেমন হবে; সংবাদ উপস্থাপক হতে চাইলে কীভাবে আবেদন করতে হবে, আবেদনের পর পরবর্তী প্রক্রিয়া কী—এসব বিষয়ে আলোচনা করেন।
একজন সংবাদ উপস্থাপকের সিভি কীভাবে তৈরি করতে হয়, সিভিতে কী কী বিষয় থাকতে হবে—এ বিষয়ে বিশেষ সেশন পরিচালনা করেন বিডিজবস লিমিটেডের এজিএম ও বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী ফিরোজ।
ফ্রিল্যান্স উপস্থাপক ও ভাষ্যকার ফয়সাল তিতুমির গল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মানুষ মূলত গল্পটাই পছন্দ করে। ‘ভ্লগ ও পডকাস্ট’ করতে গেলে গল্পটা শক্তিশালী হতে হবে। তারপর আসবে উপস্থাপনা। এখানে আত্মবিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য তথ্যের জানাশোনা লাগবে। যখন কথা বলছেন, তখন যেন মনে হয় বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং বোঝানোর সময় যাতে মনে হয়, আপনি আপনার মাকে বোঝাচ্ছেন। উপস্থাপনায় নিজস্বতা থাকতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন, পডকাস্টের ক্ষেত্রে রিসার্চ করতে হবে। অতিথিকে যে প্রশ্নই করেন, সেটার উত্তরে যাতে কোনো গল্প থাকে। অতিথির লম্বা পরিচিতি বাদ দিতে হবে।
কর্মশালায় শেষ অধিবেশনে ছিল বিশেষ প্যানেল আলোচনা। অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির সভাপতি চৌধুরী দৌলত মোহাম্মদ জাফরির সঞ্চালনায় এই পর্বে বাপকা বেটার প্রতিষ্ঠাতা শুভাশিস ভৌমিক বলেন, কনটেন্ট যাতে মানুষ মূল্য দেয়, সেভ করে রাখে—এমন ধরনের কনটেন্ট বানাতে হবে। কোনো ব্র্যান্ডের জন্য কনটেন্ট করলে কোনো একটা সমস্যার সমাধান সামনে নিয়ে আসতে হবে। সেই সমস্যা দিয়ে মানুষের সঙ্গে কানেক্ট করে তার সমাধান দেখাতে হবে।
জড়তা কাটানোর বিষয়ে শুভাশিস ভৌমিক বলেন, রেকর্ড করে নিজে শোনা, দেখা। তারপর যেখানে জড়তা হচ্ছে সেটা ঠিক করে আবার রেকর্ড করা। আরেকটা উপায় হচ্ছে, প্রথমে ছোট ছোট দৈর্ঘ্যের একাধিক ভিডিও তৈরি করা। তারপর সেই ভিডিওগুলো একসঙ্গে জোড়া লাগিয়ে বড় দৈর্ঘ্যের ভিডিও বানানো। কারণ, ছোট দৈর্ঘ্যের ভিডিওতে জড়তা কম থাকে।
স্টার টেলিভিশনের হেড অব আউটপুট ফারাবী হাফিজ বলেন, ‘উপস্থাপনার বেসিক দক্ষতা সবার থাকতেই হবে। জীবনের সব ক্ষেত্রে এটা কাজে লাগে।’ কণ্ঠের ব্যায়াম, জিহ্বার ব্যায়াম এবং ভারবাল ও নন-ভারবাল কমিউনিকেশন নিয়েও কথা বলেন তিনি।
সংবাদ পড়ার সময় দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখার ওপর জোর দেন যমুনা টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক মৌসুমী আহমেদ লোপা। তিনি বলেন, ‘ছেড়ে ছেড়ে সংবাদ পড়া যাবে না। তবে কোথায় কতটুকু বিরতি দিতে হবে, সেটা চর্চা করে শিখতে হবে। স্মার্টনেস তৈরি করতে হবে নিজের ভেতর থেকেই, কথাবার্তার মাধ্যমে।’
জাতীয় পর্ষদের সভাপতি এবং সময় টিভির জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক জাফর সাদিক বলেন, ‘রিডার হওয়া থেকে নিউজম্যান হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শুধু দেখে দেখে নিউজ পড়লে হবে না, নিউজ সম্পর্কে জানাশোনা থাকতে হবে। সারা দিন কোথায় কী হচ্ছে, জানতে হবে।’ এ আয়োজনে পাশে থাকায় অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, আপনারা শিখুন। যত বেশি কর্মশালায় অংশগ্রহণ করবেন, পরিচিত হবেন, তত বেশি বন্ধুত্ব ও নেটওয়ার্কিং তৈরি হবে। এই সম্পর্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ।’
সবশেষে বন্ধুসভাকে ধন্যবাদ জানিয়ে অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির সভাপতি চৌধুরী দৌলত মোহাম্মদ জাফরি ভবিষ্যতে যৌথভাবে আরও কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কর্মশালা শেষে অংশগ্রহণকারী সবাইকে সনদ বিতরণ করেন অতিথিরা।