একবার ভাবুন তো! ১ হাজার ৮০০ ফুট উঁচু এক প্রাকৃতিক ভূস্বর্গে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে আপনাকে তুলার মতো মেঘদল প্রতিনিয়ত ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাতাসের ঢেউয়ের সঙ্গে মেঘের স্পর্শ, শরীরে শিহরণ বেড়ে যাচ্ছে। মেঘের রাজ্য সাজেক ভ্যালিতে গেলে প্রকৃতি এভাবেই আপনাকে প্রতিনিয়ত স্বাগত জানাবে।
রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ইউনিয়নের বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র ‘সাজেক ভ্যালি’। অপরূপ এই মেঘের দেশে গেলে মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি করতে ইচ্ছা করবে। যেমনটি চেয়েছিল ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার প্রত্যেক বন্ধুর মন। মনের সেই ইচ্ছাকে পূর্ণতা দিতে ৮০ বন্ধুর একটি দল পাড়ি জমাই সাজেকে।
১৩ সেপ্টেম্বর, ঘড়ির কাঁটা রাত ১১টা ছুঁই ছুঁই। ধানমন্ডির ড্যাফোডিল এডুকেশন নেটওয়ার্কের সামনে থেকে দুটি বাস আমাদের নিয়ে সাজেকের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অবশ্য রাত আটটা থেকেই ড্যাফোডিল এডুকেশন নেটওয়ার্কের সামনে এসে জড়ো হতে থাকে বন্ধুরা। সবার মধ্যে উচ্ছ্বাস! কেউ প্রথমবার যাচ্ছে, কেউ আগেও কয়েকবার গিয়েছে। তবে ৮০ জনের বড় বহরের সঙ্গে এবারই প্রথম। তাই উচ্ছ্বাসও দ্বিগুণ। কয়েকজন পুরোনো বন্ধুও আসে আমাদের বিদায় দিতে।
বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবার উচ্ছ্বাস কয়েক গুণ বেড়ে যায়। নাচ, গান ও আড্ডায় যাত্রাপথ মুখর হয়ে ওঠে। রাত একটার দিকে কুমিল্লার মায়ামি রেস্তোরাঁয় যাত্রাবিরতির জন্য গাড়ি থামে। তার আগপর্যন্ত এভাবে নেচে-গেয়ে উল্লাস করে বন্ধুরা। বিরতি শেষে আবারও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলতে থাকে আমাদের বহনকারী দুটি বাস। এবার গানের শব্দ কিছুটা কমে আসে। অনেকে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়। সাজেকে যাওয়ার পর যে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ নেই। আর সেখানে বিশ্রাম নিলে তো ভ্রমণের সৌন্দর্য মিস হয়ে যাবে! তাই শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার এখনই সময়। আবার কয়েক বন্ধু সেটা মানতে নারাজ। তাদের এনার্জিও বেশি। সারা রাত ধরেই গান-আড্ডা করে যায়।
রাত শেষ হয়ে ভোর হওয়ার উপক্রম। হঠাৎ পাহাড়ি রাস্তায় প্রবেশ। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এখনো রাত শেষ হয়নি, ঘড়ির কাঁটা তখন চারটার ঘরে। বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি সৌন্দর্য! প্রকৃতির অপরূপ এ দৃশ্য দেখতে সব বন্ধুরা বাসের জানালায় উঁকি দেয়। অনেকে তখন ঘুমাচ্ছিল, তারাও সেই সৌন্দর্য মিস করতে চায়নি। চোখে ঘুম নিয়েই বাইরের আবহ বুঝতে চেষ্টা করছে। খাগড়াছড়ি শহরে যখন পৌঁছাই, তখন ঘড়ির কাঁটায় সকাল আটটা। এই যাত্রাপথে আমাদের সঙ্গী ছিল পুরোনো দুই বন্ধু—আলমামুন সিদ্দিকী ও আবদুল্লাহ আল মামুন ভাই। ব্যস্ততার কারণে তাদের আবার ঢাকায় ফিরে যেতে হবে। তাই আমাদের সঙ্গে আর সাজেকে যেতে পারেনি। সেখান থেকেই বিদায় জানায়।
প্রথম দিন
খাগড়াছড়ি শহরের একটি রেস্তোরাঁয় দ্রুত নাশতা সেরে নিই। সকাল নয়টার দিকে ছয়টি চান্দের গাড়ি করে সাজেক ভ্যালির উদ্দেশে আমাদের যাত্রা শুরু। এগুলো আগে থেকেই রিজার্ভ করা ছিল। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকে যাওয়ার রাস্তাটা অনেক উঁচু–নিচু ও সর্পিল। রাস্তার দুই পাশে উঁচু–নিচু সবুজ পাহাড়—সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। কোথাও চোখে পড়ে পাহাড়িদের ঘরবাড়ি। আমরা একসঙ্গে গানের সুর তুলি। বেলা ১১টা নাগাদ আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যাই। সেখানে ঝুমবৃষ্টি আমাদের স্বাগত জানায়। তাই বাইরে থাকার সুযোগ ছিল না। গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে চলে যাই রিজার্ভ করে রাখা কটেজে। মোট চারটি কটেজ রিজার্ভ করা হয়—ছেলেদের জন্য তিনটি, মেয়েদের জন্য একটি।
ফ্রেশ হতে হতে দুপুর হয়ে যায়। এবার লাঞ্চ করার পালা। মেনুতে পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমাহার, স্বাদে অনন্য। আবার কটেজে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। বিকেল চারটার দিকে সবাই মিলে কংলাক পাহাড় জয় করতে বের হই। বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড় কিছুটা পিচ্ছিল ছিল। তবে সেসব বন্ধুদের জন্য কোনো বাধা হতে পারেনি। ট্র্যাকিং করার সময় কেউ কেউ সহায়ক হিসেবে লাঠি নিয়ে নেয়। কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সেখানে ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা’ গানের তালে সবাই মিলে নৃত্য পরিবেশন করি। সেখান থেকে ফিরে আমরা চলে আসি হেলিপ্যাডে। একসঙ্গে ছবি তোলা, আড্ডা দেওয়া। কেউ কেউ ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে নিজেরা খোশগল্পে মেতে ওঠে। সন্ধ্যা হলে কেউ কটেজে ফিরে যায়, আবার কেউ বাইরে ঘোরাফেরা করে। রাত আটটায় শুরু হয় বারবিকিউ পার্টি। ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ এটি। সেখানে বিভিন্ন ধরনের মজাদার খেলাধুলা ও নাচের আয়োজন হয়। বন্ধুরা নাচ-গানের মাধ্যমে সবাইকে মাতিয়ে রাখে।
দ্বিতীয় দিন
আগের দিন অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা হয়, সঙ্গে বৃষ্টি ছিল, যেন শীতকাল নেমে এসেছে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে যাই। সাজেকের আসল সৌন্দর্য নাকি ভোরে দেখা যায়। সেটা তো মিস করা যাবে না। ঘুম ভাঙার পর দেখি, কটেজের ভেতরে মেঘেরা ভিড় করেছে। ছুঁয়েও দেখি, অসাধারণ অনুভূতি। এরপর কয়েকজন বন্ধু মিলে হেলিপ্যাডে চলে যাই। চলে ছবি তোলার পর্ব। কেউ প্রাকৃতিক দৃশ্য ভিডিও করে রাখে। আকাশে হালকা আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। সূর্য উঁকি দিচ্ছে। ধীরে ধীরে সূর্যের রশ্মি ছড়িয়ে পড়ে দিগন্ত থেকে দিগন্তে, সবুজ এই পৃথিবীর দুয়ারে। সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় ফুটে উঠেছিল পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে শুয়ে থাকা সাদা মেঘেদের দল। কয়েক বন্ধু হেলিপ্যাডের ওপরে নৃত্য পরিবেশন করেন। একদিকে স্নিগ্ধ সকাল, অন্যদিকে বন্ধুসভার বন্ধুদের নৃত্য—দৃশ্যটা বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
সকাল আটটায় ছিল নাশতার সময়। নাশতা শেষ করে সাড়ে নয়টার মধ্যে সবাই যার যার ব্যাগ গুছিয়ে চান্দের গাড়িতে উঠে পড়ি। সাজেক ভ্যালিকে বিদায় জানিয়ে রওনা হই খাগড়াছড়ির উদ্দেশে। বেলা একটার দিকে খাগড়াছড়িতে এসে পৌঁছাই। শহরের একটি হোটেলে দুপুরে খাবার পর্ব চলে। সেখান থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রিসাং ঝরনা। রাস্তা কিছুটা কঠিন। প্রথমে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে অনেকটা নিচে নামতে হয় এবং বাকি পথটুকু সিঁড়ি বেয়ে। অনেক বন্ধু ঝরনার পানিতে নেমে গোসল করেছে, কেউ কেউ আবার দূরে দাঁড়িয়ে কেবল সৌন্দর্য উপভোগ করেছে।
বিকেল চারটার দিকে আমরা চলে যাই আলুটিলা গুহায়। রিসাং ঝরনা থেকে এর দূরত্ব কাছেই। রহস্যে ঘেরা পাথরের গুহার ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। ফোনে ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে ঢুকে পড়লাম গুহার ভেতর। প্রথমে গা ছমছম করে ওঠে। সামনে কী আছে, কিছুই জানি না। চোখের সামনে শুধু অন্ধকার আর ছোট ছোট বাদুড় উড়ে যাচ্ছিল। দু-একটি বাদুড় গায়ে এসেও পড়ে। পায়ের নিচে পাথর আর পানি। কিছু জায়গায় বসে পার হতে হয়, জায়গাটা পিচ্ছিল। গুহা থেকে বের হওয়ার পর অসাধারণ অনুভূতি, যেন বিশ্ব জয় করে ফেললাম! সন্ধ্যাটা এখানে কাটিয়ে আমরা চলে গেলাম খাগড়াছড়ির হর্টিকালচার পার্কে।
এবার ফেরার পালা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে খাগড়াছড়ি শহরে ফিরে আসি। ঢাকায় ফেরার বাস রাত ১১টায়। তার আগে কিছুটা সময় থাকায় আমরা যে যার মতো বার্মিজ মার্কেটে ঘুরে বেড়াই। কেনাকাটা পর্ব চলে। রাতের খাবারের জন্য আবার সবাই একত্র হই। খাবার শেষে গাড়িতে উঠে বসি। সকাল ১০টায় ঢাকায় এসে পৌঁছাই।
বন্ধু, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা