বৈশাখে বাঙালিয়ানার রঙে রাঙা বন্ধুসভার উৎসব

অনুষ্ঠান শেষে বন্ধুদের একাংশ
ছবি: তানভীর হাসান

কাগজ দিয়ে বানানো হাতি, ঘোড়া, কুলা, ইলিশ মাছসহ বাঙালি সংস্কৃতির নানা উপাদান সভাকক্ষজুড়ে। মূল ব্যানারের দুই পাশে ঝুলছে রংবেরঙের ঘুড়ি। কক্ষের এক পাশে টেবিলে রঙিন কুলার মধ্যে বাতাসা, মুড়ি-মুড়কি রাখা। সেখান থেকে কাগজের প্লেটে করে নিয়ে নিয়ে খাচ্ছেন বন্ধুরা। অন্যদিকে মঞ্চে ঢোল ও গিটারের তালে চলছে বন্ধুদের গান ও নৃত্য পরিবেশনা।

এমন উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে ১৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার) পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদ্‌যাপন করেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হয় এ অনুষ্ঠান। সবার পরনে রঙিন পোশাক। ছেলেরা পরে আসেন পাঞ্জাবি এবং মেয়েরা শাড়ি। আর যাঁরা টি-শার্ট বা শার্ট পরে এসেছেন, তাঁদের পোশাকেও শোভা পায় বৈশাখী রং।

সমবেত কণ্ঠে ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের সুরে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান
ছবি: তানভীর হাসান

‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥’
সমবেত কণ্ঠে এই গানের সুরে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। গান পরিবেশন করেন জাতীয় পর্ষদের তাপসী রায়, কাভী সিকান্দার আলম, ঢাকা মহানগরের সাদিকুর রহমান ও তাঁদের দল। এরপরই ‘আইলো আইলো আইলো রে,/ রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে…’ গানের তালে নৃত্য পরিবেশন করেন ঢাকা মহানগরের বন্ধু হোসাইন ইসলাম।

জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের উপদেষ্টা কথাসাহিত্যিক ও মনোচিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, ‘আমাদের সবার উৎসব বাংলা নববর্ষ। এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; বরং আমাদের মানসিকতার এক গভীর প্রকাশ। এটার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। যখন আমরা “আমাদের” শব্দটিকে হৃদয়ে ধারণ করি এবং তা সর্বজনীন হয়ে ওঠে, তখনই মানুষের মধ্যে বিভাজন কমে, সহমর্মিতা বাড়ে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা পায়। নববর্ষ আমাদের শেখায় ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে, পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে এবং মানবিক মূল্যবোধকে লালন করতে। তাই আসুন, এই নববর্ষে আমরা মমতার চাষ করি।’

অনুষ্ঠানের আনন্দঘন একটি মুহূর্ত
ছবি: তানভীর হাসান

জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক বলেন, ‘আমরা বন্ধুসভার পক্ষ থেকে একদম ঘরোয়াভাবে সত্যিকারের বাঙালিয়ানার চর্চা করতে চেয়েছি। বন্ধুসভার প্রত্যেক বন্ধু বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। এই সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। আমরা বন্ধুরা যেন বাংলাদেশের কণ্ঠ হয়ে উঠি। বৈশাখকে লালন, ধারণ ও পালন করতে পারি। এ আয়োজনগুলো সে কারণেই।’

কথামালার ফাঁকে ফাঁকে ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সভাপতি হাসান মাহমুদ সম্রাটের সঞ্চালনায় চলতে থাকে একের পর এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। গান পরিবেশন করেন সাদিকুর রহমান, জাতীয় পর্ষদের হৃদয় সৈকত, সাভার বন্ধুসভার মোহনা বিনতে মোস্তাফিজ এবং ঢাকা মহানগরের অনিক সরকার ও মেঘা খেতান। নৃত্য পরিবেশন করেন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি বন্ধুসভার জেরিন আহমেদ। কবিতা আবৃত্তি করেন জাতীয় পর্ষদের উপদেষ্টা মাহবুব পারভেজ। মিউজিশিয়ান হিসেবে ছিলেন বাবু (উকুলেলে), আলামীন (ঢোল) ও ইমরান (গিটার)।

কেউ মুড়ি-মুড়কি খাচ্ছে, কেউ গান গাইছে; উৎসবের আমেজ
ছবি: তানভীর হাসান

বৈশাখ নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করেন জাতীয় পর্ষদের উপদেষ্টা উত্তম রায়, নির্বাহী সভাপতি ফরহাদ হোসেন মল্লিক, সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী ফিরোজ, নূর-ই আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বুশরা, সায়মন চৌধুরী, জেন্ডার ও সমতাবিষয়ক সম্পাদক ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সাবেক উপদেষ্টা ফাল্গুনী মজুমদার, বর্তমান উপদেষ্টা জুয়েল কুমার ঘোষ, ইসরাত জাহান ও সৌম্য আমিন।

সবশেষে ছিল মধ্যাহ্নভোজ। বৈশাখের আবহে মেনুতে রাখা হয় পুরোপুরি বাঙালি আবহ—পান্তাভাত, মাছভাজা, বেগুনভর্তা, আলুভর্তা, পেঁয়াজভর্তা, ডালভর্তা ও শুঁটকিভর্তা।

পুরো আয়োজনের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন জাতীয় পর্ষদের দপ্তর সম্পাদক আলাদিন আল আসাদ। সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বুশরা, ঢাকা মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর হাসান, সাংস্কৃতিক সম্পাদক সাদিকুর রহমান ও কার্যনির্বাহী সদস্য হোসাইন ইসলাম।