মুক্তিযোদ্ধারা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, সেই ইতিহাস কখনোই মুছে ফেলা যাবে না বলে জানিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সাইজুদ্দিন বলেছেন, ‘নতুন প্রজন্মকে বিকৃত বা নতুন করে বানানো কোনো ইতিহাস শেখানো উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং একাত্তরের মর্মান্তিক ঘটনাগুলো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে।’
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর আইডিয়াল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে গাজীপুর বন্ধুসভা আয়োজিত ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোহাম্মদ সাইজুদ্দিন এ কথা বলেন।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী এই অলিম্পিয়াড আয়োজন করেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ শিরোনামে মার্চ মাসজুড়ে দেশব্যাপী এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সাইজুদ্দিন জানান, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের সাকাশ্বর এলাকায় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা। সে সময় জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। অনেকেই শহীদ হয়েছেন, অনেকেই আহত হয়েছেন।
সেই ত্যাগের ইতিহাস ভুলে যাওয়ার নয় উল্লেখ করে মোহাম্মদ সাইজুদ্দিন বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করেছি যেন আগামী প্রজন্ম স্বাধীন দেশে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। তাই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব।’
গাজীপুর বন্ধুসভার দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক তানিয়া আক্তারের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন সফিপুর আইডিয়াল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হাবিবুর রহমান, সাংবাদিক ও লেখক ফারদিন ফেরদৌস, প্রথম আলোর গাজীপুর প্রতিনিধি মাসুদ রানা, সাংবাদিক এ কে এম শিশির, গাজীপুর বন্ধুসভার সভাপতি বাবুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক জি রাবেক তারেক ও জাকির হোসেন।
সাংবাদিক ও লেখক ফারদিন ফেরদৌস বলেন, ‘স্বাধীনতা মানে শুধু দাসত্ব বা শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়া নয়; স্বাধীনতা মানে মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ পাওয়া। স্বাধীনতা মানে আনন্দকে জাগিয়ে রাখা, আর পরাধীনতা হলো বেদনার নাগপাশে বন্দী থাকা। স্বাধীনতার মাসে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানলে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ দৃঢ় হবে।’
সফিপুর আইডিয়াল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘একজন শিশু যখন ছোটবেলা থেকেই তার জন্মভূমি সৃষ্টির প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে, তখন তার মধ্যে দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। তাই প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষকদের উচিত স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস শিশুদের সামনে তুলে ধরা।’
হাবিবুর রহমান বলেন, ‘স্মার্ট বাংলাদেশের কোনো সন্তান যেন মাদকাসক্ত না হয়—এ বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। সন্তানদের প্রতি সব সময় খেয়াল রাখতে হবে এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে।’
কলেজের প্রভাষক এজি কায়কোবাদ অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রতিদিনই কিছু সময় হলেও সন্তানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে কথা বলা উচিত। এতে তারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।’
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক এই কুইজ প্রতিযোগিতায় মোট ১০৮ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। প্রাথমিক বাছাই শেষে সেখান থেকে ৫ জনকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। বিজয়ীরা হলো মো. আরাফাত, তনুজা রায়, সাজিদ তালুকদার, সাহেদ ইসলাম ও তাফফীম হাসান। সবাই সফিপুর আইডিয়াল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। বিজয়ীদের হাতে উপহার হিসেবে বই তুলে দেওয়া হয়।
এর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। কুইজ প্রতিযোগিতায় ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ৩০টি প্রশ্ন। সময় ছিল ২০ মিনিট।
অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গাজীপুর বন্ধুসভার সহসভাপতি আশিকুল ইসলাম খান, কার্যনির্বাহী সদস্য মোশাররফ হোসেন, ম্যাগাজিন সম্পাদক রক্সি বিজয়, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক তানিয়া আক্তার, বন্ধু মারুফ আল গালিব, সুমাইয়া আক্তারসহ অন্য বন্ধুরা।