‘ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি’—কথাটি চিরায়ত হলেও কর্মব্যস্ত এই নাগরিক জীবনে ঈদের আনন্দ যেন ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছুটি শেষে সবাই যখন প্রাত্যহিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই সেই ফেলে আসা ঈদের আমেজ আর বন্ধুত্বের টানকে নতুন করে ঝালিয়ে নিতে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা ‘ঈদের স্মৃতিগুচ্ছ’ শিরোনামে আয়োজন করেছে এক আনন্দ অনুষ্ঠান। যান্ত্রিকতার ভিড়ে একে অপরের সান্নিধ্যে একটু প্রশান্তি খুঁজে নেওয়ার এক অনন্য প্রয়াস।
শুরুতেই বন্ধু অতন্দ্রিলা রিয়া এবং সহসভাপতি নুরুজ্জামান খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। বন্ধুদের সমস্বরে গাওয়া ঈদের কালজয়ী গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে...’–এর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। নৃত্য পরিবেশন করেন সাংস্কৃতিক সম্পাদক তিথি তালুকদার, যা উপস্থিত দর্শকদের মুহূর্তেই এক অপার্থিব ভালো লাগায় ভরিয়ে দেয়।
গানের সুরে সুরে হারানো স্মৃতি যেন বারবার ফিরে আসছিল। বন্ধু রিমি বিশ্বাস যখন গাইলেন ‘দিন বাড়ি যায়’, তখন মহলজুড়ে এক স্মৃতিকাতর আবহ তৈরি হয়। এরপর সুরের জাদু নিয়ে মঞ্চে আসেন বন্ধু ইসরাত জাহান। তাঁর কণ্ঠে ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ ও ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি’ গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয়ে দাগ কেটে যায়।
এরপর গানের এই স্রোতে যুক্ত হন দপ্তর সম্পাদক জয় চক্রবর্তী, যিনি তাঁর দরাজ কণ্ঠে ‘বন্ধু’ গানটি গেয়ে বন্ধুত্বের গভীরতাকে মনে করিয়ে দেন। সংগীতের এই আবেশ আরও রঙিন হয় যখন রিমি বিশ্বাস ও জয়শ্রী মজুমদার মিলে একটি দারুণ কোরাস পরিবেশন করেন। অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল বন্ধু মিশেল শর্মা, অর্ঘ্যজিৎ বড়ুয়া ও জয়বর্ধন বড়ুয়ার পরিবেশনায় ‘সে যে বসে আছে একা একা’ গানটি। তাঁদের তৈরি ফোক ম্যাশআপটি ছিল এককথায় অসাধারণ! ছোট্ট বন্ধু সান্নিধ্যা কর্মকারের কণ্ঠে ‘আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব’ গানটি সবার মুখে হাসি ফোটায়।
সুরের মাঝখানে ছিল আবেগঘন কথামালা। স্মৃতিচারণা ও অনুভূতি শেয়ার করে অনুষ্ঠানকে সিক্ত তোলেন বন্ধুরা। জয়শ্রী মজুমদার, নুরুজ্জামান খান, ইব্রাহিম তানভীর, কামরান চৌধুরীসহ উপস্থিত অনেক বন্ধু তাঁদের ঈদের অভিজ্ঞতার ডালি সাজিয়ে বসেন। কথামালায় অংশ নেন সাধারণ সম্পাদক ইরফাতুর রহমান, বন্ধু প্রান্তিকা ভৌমিক, ইষ্টি পাল, তিশমা দাস, সুদীপ্ত চাকমাসহ অন্যরা।
গানের ছন্দে সবাই যখন মোহিত, তখন বন্ধু তাফসিরুল ইসলাম আবৃত্তি করেন কবি কায়কোবাদের ‘ঈদ আবাহন’ কবিতা। কামরান চৌধুরী তাঁর স্বরচিত কবিতা ‘ঈদ’ আবৃত্তি করার পাশাপাশি নিজের ঈদের স্মৃতি শেয়ার করে সবার মন জয় করে নেন।
মাঝপথে সবাইকে অবাক করে দিতে হাজির হন অর্থ সম্পাদক ফয়সাল হাওলাদার। তাঁর চমৎকার সব জাদু প্রদর্শনী পুরো আসরকে মাতিয়ে রাখে। অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগপ্রবণ মুহূর্ত ছিল যখন সবার মধ্যে চকলেট ও চিরকুট বিতরণ করা হয়। সুন্দর সুন্দর ছন্দে ভরা সেই উইশ লেটার বা চিরকুটগুলো যেন একে অপরের প্রতি ভালোবাসার এক স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
বাঙালি আড্ডায় ভূরিভোজ হবে না, তা কি হয়? অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল মিষ্টিমুখের আয়োজন। সেমাইয়ের স্বাদে আর আড্ডার মিষ্টতায় সবাই একে অপরের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন। সবশেষে নুরুজ্জামান খান তাঁর সমাপনী বক্তব্যে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে ছিলেন বন্ধু তাজরিয়া রশিদ, অতন্দ্রিলা রিয়া ও তুষার কবির।
বন্ধুদের এই আড্ডা আর ভালোবাসার বন্ধন যেন অটুট থাকে চিরকাল। কর্মব্যস্ততার ভিড়ে এমন একটি দিন স্মৃতি হয়ে থাকবে সবার হৃদয়ে, ঠিক যেন কোনো এক সোনালি বিকেলের মিষ্টি রোদ।
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা