সকাল সাড়ে ছয়টা। জেলা শিল্পকলা একাডেমির শিশির ভেজা মাঠে শীতের তীব্রতা কমাতে জ্বালানো হয় আগুন। বন্ধুসভার সদস্যরা খড়কুটো ও লাকড়ি খুঁজে খুঁজে জড়ো করে আগুন জ্বালান। আগুন পোহানোকে ঘিরে তৈরি হয় ছোট আড্ডা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও শহুরে জীবনের ব্যস্ততার মাঝখানে এই আয়োজন যেন এক টুকরা স্বস্তির নিশ্বাস।
‘শীতের চাদরে মায়ায় টান, কুয়াশা উৎসবে মেতে ওঠে প্রাণ’ স্লোগানে ২২ জানুয়ারি এমনই পরিবেশে কুয়াশা উৎসবের আয়োজন করে নোয়াখালী বন্ধুসভা। সভাপতি আসিফ আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক সানি তামজীদের সঞ্চালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সহসভাপতি মোহাম্মদ শিমুল।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে উৎসব। পরিচয় পর্ব শেষে বন্ধুরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। গল্পে গল্পে উঠে আসে শীতের সকাল, পুরোনো দিনের স্মৃতি আর বন্ধুত্বের কথা।
উপদেষ্টা মাহফুজের রহমান বলেন, ‘বন্ধুসভার আয়োজন মানেই ভিন্ন কিছু। নিজেকে ঘরের ভেতর আটকে রাখতে পারি না। শরীর খারাপ থাকার পরও আজ এসেছি। বর্তমান যুবসমাজ সামাজিক কাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সেখানে বন্ধুসভার বন্ধুরা ব্যতিক্রম। কুয়াশা উৎসবে এসে ছোটবেলার শীতের স্মৃতি ফিরে পাচ্ছি।’
উপদেষ্টা সুমন নূর বলেন, ‘কুয়াশা খুব বেশি না থাকলেও উৎসব জমে উঠেছে। বন্ধুরা একসঙ্গে থাকলে আনন্দ থাকবেই। এ ধরনের আয়োজন বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করে।’
অনুভূতি ব্যক্ত করেন হোমিও বিশেষজ্ঞ করবী রাণী দাস।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ২০২৬ সালের কার্যনির্বাহী কমিটির শপথ পাঠ। নবগঠিত কমিটির সদস্যরা সংগঠনের আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন। শপথ পাঠ করান উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান। তিনি সবাইকে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানিয়ে বলেন, ‘এরই মধ্যে শীতের সকালের মিষ্টি রোদ একটু একটু করে চলে আসছে। অনুষ্ঠান উপভোগ করছি। আশা করছি, কমিটি ও কমিটির বাইরের বন্ধুরা মিলে সারা বছর ভালো কাজ করে যাবে।’
একপর্যায়ে উপদেষ্টারা ২০২৫ সালের বিদায়ী সভাপতি উম্মে ফারহিন ও বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শিমুলের হাতে স্মারক তুলে দেন। উম্মে ফারহিন বলেন, ‘নোয়াখালী বন্ধুসভা আমার আপন জায়গা। এখানে সবাই আমার আপনজন। আশা করি আগামী দিনেও নোয়াখালী বন্ধুসভা ভালো কাজের ধারা অব্যাহত রাখবে এবং সেরাদের কাতারে থাকবে।’
এ সময় উপদেষ্টারা নতুন সভাপতি আসিফ আহমেদের হাতে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন। তিনি বলেন, ‘এক বছর কমিটিতে না থাকলেও বন্ধুসভার সঙ্গে সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। আবারও আমাকে নতুন করে পুরোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সব সময়ের মতোই বন্ধুসভার সঙ্গে থাকব।’
২০২৫ সালের কার্যক্রমের ভিত্তিতে ‘বর্ষসেরা বন্ধু’ হিসেবে স্মারক প্রদান করা হয় সাধারণ সম্পাদক সানি তামজীদ, অর্থ সম্পাদক সাহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নয়ন চন্দ্র কুরী ও দপ্তর সম্পাদক জুনাইন কাউসারকে। পাঠচক্রে সক্রিয় ভূমিকার জন্য ‘বর্ষসেরা পাঠক’ হিসেবে স্মারক তুলে দেওয়া হয় সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিদা রেশমি ও পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক শান্ত চন্দ্রকে।
ছিল মজার মজার ধাঁধা জিজ্ঞাসা, যা উৎসবে বাড়তি আনন্দ যোগ করে। কখনো হাসিতে ফেটে পড়েন বন্ধুরা, কখনো আবার সঠিক উত্তর দিতে অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। এই পর্ব পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। এই পর্বে বিজয়ী হয়ে মঞ্চে এসে তিনটি চরিত্রে বিক্রেতার ভূমিকায় অভিনয় করেন প্রশিক্ষণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক ফাতেমা কানিজ এবং পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক শান্ত চন্দ্র দে।
সাংস্কৃতিক পর্ব যেন কুয়াশা উৎসবের প্রাণ। গান পরিবেশন করেন সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রান্ত চন্দ্র শীল ও সীমান্ত কুরি বিজয়। তাঁদের গানে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আরও মুখর। আবৃত্তি পরিবেশন করেন পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক ফাতেমা কানিজ।
শীতের সকালের আনন্দকে পূর্ণতা দেয় খেজুরের রসের পায়েস ও গরম খিচুড়ি। এই খাবার কেবল বন্ধুসভার সদস্যদের মধ্যেই নয়, আশপাশের সাধারণ মানুষ ও পথচারীদের মাঝেও বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া উৎসবে ছিল র্যাফল ড্রর আয়োজন, যা উপস্থিত সবার মধ্যে বাড়তি আনন্দ তৈরি করে। বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বিশেষ উপহার।
পাঁচ বছর ধরে নোয়াখালী বন্ধুসভা নিয়মিতভাবে কুয়াশা উৎসব আয়োজন করে আসছে। এ বছর উৎসবের সমন্বয়ক ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নয়ন চন্দ্র কুরী।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা মিলিয়ে যায়, ছড়িয়ে পড়ে দিনের মিষ্টি রোদ। শেষ হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, তবে বন্ধুরা সঙ্গে করে নিয়ে যান এক উষ্ণ সকালের গল্প, যা আবার ফিরে আসবে পরের শীতে, আরেকটি কুয়াশা উৎসব হয়ে।
উৎসবে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ হোসেন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক আরাফাত শিহাব, জেন্ডার ও সমতাবিষয়ক সম্পাদক জয়শ্রী নাথ, প্রশিক্ষণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক পুনম রানী নাথ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক নাফিস আহমেদ, বইমেলা সম্পাদক ফয়সাল আহম্মেদ, বন্ধু রুমাইয়া সুলতানা, সানজিদা সুলতানা, অর্ঘ্য ভূঁঞা, সাফিয়া, রিতুসহ অনেকে।
সভাপতি, নোয়াখালী বন্ধুসভা