‘বল বীর- বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!’
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই উচ্চারণ এক শতাব্দী পেরিয়েও আজও সমান তেজস্বী, যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের মুক্তি এবং আত্মমর্যাদার এই চিরন্তন বার্তা নতুন করে প্রাণ পেল প্রথম আলো বন্ধুসভার আয়োজনে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ১১ জুন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রথম আলো বন্ধুসভা। ‘এ ঘোর প্রলয়-নেশা, সে যে তমো বিভীষিকা’ শিরোনামে সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হয়ে অনুষ্ঠান চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সহযোগিতায় অনুষ্ঠানে অংশ নেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদ, ঢাকা মহানগর, গাজীপুর, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার বিভিন্ন বন্ধুসভার বন্ধুরা।
বন্ধুদের পদচারণ, কবিতার উচ্চারণ আর নজরুলসংগীতের সুরে সন্ধ্যার শুরু থেকেই মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। তৌহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী সভাপতি ফরহাদ হোসেন মল্লিক। এরপর একে একে শুরু হয় আবৃত্তি, গান, নৃত্য এবং নজরুলচর্চাকে ঘিরে আলোচনা।
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও বন্ধুসভার পৃষ্ঠপোষক আনিসুল হক বলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম জিনিয়াস; সহজাত প্রতিভা যাকে বলে। যে প্রতিভাগুলো বিকৃত করা যায় না। বাইশ বছর বয়সে তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিতা “বিদ্রোহী” লিখেন। যা সেই সময়ে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। শুধু কবিতাই নয়, কাজী নজরুল ইসলামের গানও ওই সময়ে সাংঘাতিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ওনার গানের রেকর্ড বের করার জন্য রেকর্ড কোম্পানিগুলো অপেক্ষা করত, বসে থাকত।’
নজরুলের অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করে আনিসুল হক বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম সবচেয়ে সুন্দর কণ্ঠে, সবচেয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ব্যক্তিমানুষের জয় ঘোষণা করলেন, ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির!’
বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় কবি নজরুলের প্রাসঙ্গিকতার কথা তুলে ধরেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক। তিনি বলেন, ‘বন্ধুসভার আয়োজনে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি। সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে ঘটে যাওয়া নির্মম হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনাগুলো আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। এমন একসময়ে নজরুলের কবিতা আমাদের প্রতিবাদ, সাহস ও জাগরণের শক্তি।’
অনুষ্ঠানের শিরোনাম প্রসঙ্গে জাফর সাদিক বলেন, ‘প্রলয়ও যে কখনো অন্যায় ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে জেগে ওঠার উল্লাসের কারণ হতে পারে, সেই ভাবনা থেকেই “এ ঘোর প্রলয়-নেশা, সে যে তমো বিভীষিকা” স্লোগানটি দেওয়া। এ আয়োজনের মাধ্যমে আমরা শুধু আবৃত্তি প্রতিযোগিতাই করিনি, বরং নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা, মানবিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইমুন মৌসুমী বৃষ্টি।
আলোচনা পর্বের পাশাপাশি ছিল আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মনোমুগ্ধকর আয়োজন। কবিতা আবৃত্তি করেন জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের উপদেষ্টা মাহবুব পারভেজ। কাজী নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’ কবিতা আবৃত্তি করেন ড্যাফোডিল বন্ধুসভার সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোহাম্মদ ত্বোয়া-হা। আবৃত্তি করেন মহানগর বন্ধুসভার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক আফিয়া ইবনাত। নজরুলকে নিয়ে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন গাজীপুর বন্ধুসভার বন্ধু হিরু মিয়া। প্রতিযোগিতার বিজয়ী আমায়া ইসলাম ও তাইয়্যেবা জামানের কণ্ঠেও ধ্বনিত হয় নজরুলের কবিতা।
নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন বন্ধু দুর্জয় কুমার এবং ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেশমান ইসলাম।
নজরুলের গান ‘শ্যাম সুন্দর গিরিধারী’র সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন ড্যাফোডিল বন্ধুসভার বন্ধু স্নিগ্ধা পালমা। তাঁর সুনিপুণ নৃত্যভঙ্গি ও অভিব্যক্তি দর্শকদের মুগ্ধ করে। করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সভাকক্ষ।
আবৃত্তি প্রতিযোগিতার বিচারক ও আবৃত্তিশিল্পী শিমুল সালাহ্উদ্দিন আবৃত্তির শিল্পসত্তা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আবৃত্তি শুধু কবিতা মুখস্থ বলে যাওয়ার বিষয় নয়; এটি একটি নির্মাণপ্রক্রিয়া। একটি কবিতাকে বুঝতে হয়, তার ভাব, আবেগ, ছন্দ ও অন্তর্নিহিত শক্তিকে আত্মস্থ করতে হয়। এরপর কণ্ঠ, উচ্চারণ, বিরতি, গতি ও অনুভূতির সমন্বয়ে কবিতাটিকে নতুন করে শ্রোতার সামনে নির্মাণ করতে হয়।’
সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা