১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গামা নামের এক রাজাকারের একমাত্র কাজ ছিল কোন বাড়িতে মেয়েরা আছে, সেই খবর পাকিস্তানি বাহিনীকে দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন ও জঘন্য অপরাধের কথা স্মরণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) তৌফিকুর রহমান বলেন, সেই রাজাকারের তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তানি হানাদাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের তুলে নিয়ে যেত। তারপর চালানো হতো জঘন্য পাশবিক নির্যাতন।
রণক্ষেত্রে এক পাগলপ্রায় নারীর দেখা পাওয়ার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা শোনান এক হৃদয়বিদারক গল্প। বাংকারে আটকে রেখে নির্যাতনের শিকার সেই নারীর অবস্থা বর্ণনা করে কর্নেল (অব.) তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার ওই নারী কিছুই বুঝতে পারছিল না। তার সবকিছু পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছিল। শুধু যেই ঘরে ঘুমাত, সেই ঘরটা চিনতে পেরেছিল।’
প্রথম আলো বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের ঢাকা পর্বে অতিথির বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের সামনে এভাবেই যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) তৌফিকুর রহমান। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে আজ সোমবার রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এই অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে প্রথম আলো বন্ধুসভা। নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তাৎপর্য ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে গত মার্চ মাসজুড়ে দেশের ৬৪টি জেলাসহ মোট ৭৬টি স্থানে প্রথমবারের মতো এই অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়। আজ হয়েছে সমাপনী পর্ব।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) তৌফিকুর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেন। বক্তব্যে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর টিটোর শহীদ হওয়ার ঘটনার স্মৃতিচারণা করেন। এ ছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনীর নির্মমতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরত্বের ইতিহাস তুলে ধরেন। স্বাধীন জন্মভূমি কতটা ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল, সেটা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হওয়ার আহ্বান জানান।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কর্নেল (অব.) তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘তোমাদের অনেক দায়িত্ব। প্রথম দায়িত্ব হলো দেশকে ভালোবাসা। দেশকে ভালোবাসলেই দেশ উন্নতি করবে। কোনো বাধাই তখন আর বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আমি তোমাদের অনুরোধ করব, তোমরা যখন বড় হবে, তোমরা যখন কোনো পেশায় যাবে—সেটা ডাক্তার হোক, ইঞ্জিনিয়ার হোক বা যেকোনো পেশা, সব সময় মনে রাখবে—তোমার একটা দেশ আছে এবং এই দেশের প্রতি তোমার একটা দায়বদ্ধতা আছে।’
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের প্রতি দেশপ্রেম ও জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বাংলাদেশকে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর দেশ হিসেবে অভিহিত করে শিক্ষার্থীদের দেশকে ভালোবাসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই দেশের সবুজ, এই দেশের বাতাস, এই দেশের বৃষ্টি, এই দেশের রোদ—পৃথিবীর আর কোথাও এ রকম মায়াময় নয়।’
মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার পেছনে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে আনিসুল হক বলেন, ‘এই দেশটাকে ভালোবেসো, আর জ্ঞান অর্জন করো। কারণ, তুমি যদি জ্ঞানী হও, তুমি যদি দক্ষ হও, তাহলে তুমি তোমার পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উপকার করতে পারবে।’
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব নিয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও চেতনার কারণেই আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। তরুণ প্রজন্মের উচিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আদর্শকে গভীরভাবে জানা ও উপলব্ধি করা।’
মুক্তিযুদ্ধে আমরা ভূখণ্ড ও পতাকা পেলেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি উল্লেখ করে মোহাম্মদ জিয়াউল আলম বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে আমরা এখনো বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল। এই অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেওয়া এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার মূল দায়িত্ব এখন বর্তমান প্রজন্মের ওপর।’
বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের নির্বাহী সভাপতি ফরহাদ হোসেন মল্লিক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, দেশ-বিদেশে বিস্তৃত বন্ধুসভা বন্ধুদের জন্য দেশপ্রেম, স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব ও লেখা শাণিত করার প্ল্যাটফর্ম। তারা নিয়মিত পাঠচক্র, বৃক্ষরোপণ, ভালো কাজের প্রতিযোগিতা এবং দরিদ্রদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির মতো মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। তিনি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বন্ধুসভার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব শিক্ষার্থীদের প্রতি দেশপ্রেম, স্মার্টফোনে আসক্তি ও সততার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিজেকে গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ফলের চেয়ে নিরন্তর চেষ্টা ও সততাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
এই অভিনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘যাঁরা আমাদের জন্য লড়েছেন, তাঁদের কোনো দিন যাতে আমরা না ভুলে যাই। তবেই আমরা বাংলাদেশ হয়ে উঠব।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক আশফাকুজ্জামান, মাইলস্টোন কলেজের শিক্ষক মোহাম্মদ শাফায়েত উদ্দিন। সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ‘মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড’ শুরু হয়। এতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
অলিম্পিয়াডের কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছে ১০ জন। তারা হলো মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মুস্তাকিম মাহফুজ (প্রথম), তানভীর আহমেদ (দ্বিতীয়), লতিফুর রহমান (তৃতীয়), আরিশা তাহনিয়া (চতুর্থ), অজয় সূত্রধর (পঞ্চম), সাজিদ আল মাহিদ (ষষ্ঠ), মাহামুদুল হাসান (সপ্তম), আবিদ হাসান (অষ্টম), আতিয়া মাহমুদা (নবম) ও শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া জাহান (দশম)। তাৎক্ষণিক কুইজে আরও দুজনকে পুরস্কৃত করা হয়।