যে কাজ করছি, সেটিই কি আসলে আমাদের কাজ

প্রতীকী ছবি: এআই/বন্ধুসভা

পৃথিবীতে মানুষের আসার পেছনে কোনো না কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে আমাদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বাস করি। কেউ মনে করেন, জীবনের গতিপথ আগে থেকেই নির্ধারিত। আবার কেউ মনে করেন, চলার পথের অভিজ্ঞতা, পছন্দ ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই মানুষ ধীরে ধীরে পৃথিবীতে নিজের পথ তৈরি করে। তবে একটি বিষয় স্বীকার করতেই হবে—প্রত্যেক মানুষের স্বভাব, আগ্রহ, প্রতিভা ও পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।

কিছু মানুষকে দেখলে মনে হয়, তাঁরা যে কাজটি করছেন, সেটি যেন তাঁদের জন্যই তৈরি। স্টিভ জবস, ডলি পার্টন কিংবা অ্যান্থনি বোর্দেইনের কথাই ধরা যাক। তাঁদের অন্য কোনো সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায় কল্পনা করা কঠিন। কারণ, তাঁরা যে কাজ করেছেন, তার মধ্যে তাঁদের ব্যক্তিত্ব, আগ্রহ ও বিশেষ গুণগুলো খুব স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

স্টিভ জবস প্রযুক্তির সঙ্গে নকশাকে এমনভাবে মিলিয়েছিলেন, যাতে জটিল প্রযুক্তিপণ্যও মানুষের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ডলি পার্টন নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা ও গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতাকে গানে রূপ দিয়েছেন। অ্যান্থনি বোর্দেইনের কৌতূহল ও বিভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ তাঁকে খাবার, ভ্রমণ ও মানুষের জীবন নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে।

স্টিভ জবস, ডলি পার্টন কিংবা অ্যান্থনি বোর্দেইনের জন্মের সময়ই তাঁরা কী হবেন, তা নির্ধারিত ছিল—এমনটা বলা কঠিন। তবে তাঁদের কিছু স্বাভাবিক গুণ ও আগ্রহ ছিল, যা জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আরও বিকশিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই গুণগুলোর সঙ্গে তাঁদের কাজের চমৎকার মিল তৈরি হয়েছে।

তাই জীবনের উদ্দেশ্য বলতে হয়তো এমন কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজকে বোঝায় না, যা করার জন্য মানুষ জন্ম থেকেই নির্ধারিত; বরং এমন কাজ খুঁজে পাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে নিজের স্বাভাবিক দক্ষতা, আগ্রহ ও মূল্যবোধ একসঙ্গে কাজে লাগানো যায়।

কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, মানুষ সাধারণত এমন কাজেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, যেখানে তার নিজের শক্তিগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে। কারও ভালো লাগে স্বাধীনভাবে কাজ করতে। কেউ নতুন কিছু তৈরি করতে পছন্দ করেন। কেউ নেতৃত্ব দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আবার কেউ মানুষের সমস্যা সমাধান করতে বা অন্যকে শেখাতে আনন্দ পান।

অর্থপূর্ণ কাজের সঙ্গে ব্যক্তির এসব বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা বিশ্লেষণে ১৪৪টি পৃথক গবেষণায় প্রায় ৫২ হাজার মানুষের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, দায়িত্বশীলতা, অন্যের প্রতি সহমর্মিতা, উদ্যোগী মনোভাব ও কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার মতো ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অর্থপূর্ণ কাজের সম্পর্ক রয়েছে।

অর্থাৎ কাজটি কী, শুধু সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কে কাজটি করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানুষ কর্মক্ষেত্রে শুধু তার দক্ষতা নিয়ে যায় না; সঙ্গে নিয়ে যায় তার ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, আগ্রহ ও জীবনের অভিজ্ঞতাও। যে কাজের সঙ্গে এসব বিষয় ভালোভাবে মিলে যায়, সেই কাজ অনেক বেশি অর্থপূর্ণ মনে হতে পারে।

আরেকটি গবেষণায় ৯৯৫ মার্কিন কর্মীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যাঁরা নিজেদের কাজকে বেশি অর্থপূর্ণ মনে করেন, তাঁরা সাধারণত কাজ নিয়ে বেশি সন্তুষ্ট এবং নিজেদের জীবন নিয়েও বেশি ভালো বোধ করেন। গবেষণায় আরও দেখা যায়, কর্মজীবন নিয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সঙ্গেও কাজকে অর্থপূর্ণ মনে করার সম্পর্ক রয়েছে।

এর মানে হলো, অর্থপূর্ণ কাজ সব সময় এমন কিছু নয়, যা হঠাৎ খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক সময় নিজের সম্পর্কে ভালোভাবে জানার পর এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে মানুষ নিজের কাজকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে।

তবে জীবনে ‘পারফেক্ট’ কাজ পাওয়া সব সময় সম্ভব নয়। কোনো কাজেই সব সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া যায় না। ভালো বেতন, সামাজিক মর্যাদা, চাকরির নিরাপত্তা—এসব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু এগুলো দিয়ে বোঝা যায় না, কাজটি একজন মানুষের জন্য সত্যিই উপযুক্ত কি না।
তাই চাকরি বেছে নেওয়ার সময় শুধু ‘কোথায় বেশি টাকা পাব?’ কিংবা ‘কোন চাকরিতে বেশি মর্যাদা আছে?’—এমন প্রশ্নের পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে:
কোন ধরনের কাজ আমার ভেতরের সেরাটাকে বের করে আনে?

কারও ক্ষেত্রে উত্তর হতে পারে কঠিন সমস্যা সমাধান করা। কারও ক্ষেত্রে কিছু তৈরি করা, কাউকে শেখানো, মানুষের যত্ন নেওয়া কিংবা কোনো জটিল কাজ পরিচালনা করা। একজনের কাছে যে কাজ আনন্দের, অন্যজনের কাছে সেটিই হয়তো বিরক্তিকর। তাই অর্থপূর্ণ কাজের ধারণাটি সবার জন্য এক নয়।

আরও পড়ুন

কোনো কাজে ভালো করলেই যে কাজটি নিজের জন্য উপযুক্ত হবে, এমনটাও নয়। একজন মানুষ কোনো কাজে দক্ষ হতে পারে, ভালো আয় করতে পারে, প্রশংসাও পেতে পারে। তারপরও সেই কাজ তার জন্য অর্থপূর্ণ না–ও হতে পারে। কারণ, কাজটি হয়তো তার প্রকৃত আগ্রহ, মূল্যবোধ কিংবা সক্ষমতার সবচেয়ে ভালো ব্যবহার করছে না।

এ ক্ষেত্রে নিজের অতীত অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকানো যেতে পারে। কোন কাজ করার সময় সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে? কোন কাজ করতে গিয়ে সময়ের কথা মনে থাকেনি? কোন দায়িত্ব পালন করলে ক্লান্তির বদলে নতুন উদ্যম পাওয়া গেছে? কোন ধরনের সমস্যার সমাধান করতে মানুষ বারবার আপনার সাহায্য চেয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু জানাতে পারে।

আমরা সাধারণত কোন কাজগুলো পছন্দ করিনি, সেগুলো নিয়েই বেশি ভাবি। এটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আরও কিছু বিষয় খুঁজে বের করা দরকার—কোন কাজে আমরা স্বাভাবিকভাবে ভালো, কী আমাদের আগ্রহী করে, কোন বিষয়গুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোথায় আমরা সবচেয়ে ভালো অবদান রাখতে পারি।

জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোও অনেক সময় ভবিষ্যতের কাজকে প্রভাবিত করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে জীবনের কষ্টগুলো কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যেই ঘটেছে বা কষ্ট পাওয়াটা ভালো কিছু। জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে, যেগুলো মানুষ কখনোই চাইত না। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে পরে কী শেখা যাবে বা কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যাবে, সেটি মানুষের নিজের হাতে থাকে।

কর্মজীবনেও একই বিষয় দেখা যায়। কোনো চাকরি হয়তো প্রথমে মনে হতে পারে ভুল সিদ্ধান্ত। পরে দেখা গেল, সেই কাজই এমন একটি দক্ষতা শিখিয়েছে, যা ভবিষ্যতে খুব কাজে লেগেছে। কোনো দায়িত্ব হয়তো তখন খুব সাধারণ মনে হয়েছিল, কিন্তু কয়েক বছর পর সেটিই বড় কোনো সুযোগের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমনকি যে কাজ শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, কোন ধরনের কাজ নিজের জন্য উপযুক্ত নয়।

তাই কর্মজীবনকে শুধু চাকরি, পদোন্নতি কিংবা সাফল্যের তালিকা হিসেবে দেখলে অনেক কিছু বাদ পড়ে যায়; বরং কর্মজীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে নিজের সম্পর্কে একটি করে সূত্র হিসেবে দেখা যেতে পারে।

পৃথিবীতে আসার সময় কেউই জানে না, জীবনে ঠিক কী করতে হবে। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু বিশেষ গুণ, আগ্রহ ও সক্ষমতা থাকে। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে সেগুলোকে চিনতে সাহায্য করে। হয়তো জীবনের উদ্দেশ্য আগে থেকেই লেখা কোনো উত্তর নয়; বরং নিজের ভেতরের শক্তিগুলোকে চিনে, সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে এবং জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে ধীরে ধীরে সেই উদ্দেশ্য তৈরি করে নিতে হয়।

লেখক: মার্ক সি ক্রাউলি
সূত্র: সাইকোলজি টুডে