প্রশংসা পাচ্ছেন, কিন্তু পদোন্নতি পাচ্ছেন না কেন
মোহাম্মদ ইব্রাহিম (ছদ্মনাম), ঢাকার একটি বড় করপোরেট অফিসে আইটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন। অফিসের যেকোনো প্রযুক্তিবিষয়ক সমস্যায় সবার আগে তাঁর ডাক পড়ে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধানও করে দেন তিনি। চার বছর ধরেই এ কাজ করছেন। যে পজিশনে চাকরিতে জয়েন করেছিলেন, এখনো সেই পজিশনেই আছেন। কোনো পদোন্নতি হয়নি। বসকে বললে প্রতিবার জানান, এবার হবে; কিন্তু বছর শেষে দেখা যায় অন্য অনেকেরই পদোন্নতি হয়েছে, শুধু সে ছাড়া।
এই দৃশ্য পরিচিত লাগছে? প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই এমন গল্প ও মানুষ রয়েছে। পদোন্নতি না হওয়ার পেছনে কিন্তু ইব্রাহিমের ব্যর্থতা নেই; বরং সব সমস্যার সমাধান করে যেন এক অদৃশ্য মূল্য পরিশোধ করছেন, যাকে বলা যায় ‘দক্ষতার কর’।
দক্ষতার কর কী
যাঁরা সব সময় দায়িত্বশীল, দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য—তাঁদের অনেকের ক্যারিয়ারেই এই অদৃশ্য মূল্য দিতে হয়। কারণ, তাঁরা যত ভালো কাজ করেন, পুরস্কার হিসেবে তত বেশি দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে এসে পড়ে। অথচ সেই কাজের বিনিময়ে তাঁরা সব সময় নতুন সুযোগ বা পদোন্নতি পান না।
এর কারণ খুবই সাধারণ। প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব সাধারণত ঝুঁকি কমাতে চান। তাঁরা জানেন, একজন মানুষ আছেন যিনি চাপের মধ্যেও কাজ শেষ করে দিতে পারবেন। তাই প্রতিবার জরুরি পরিস্থিতিতে সেই একই মানুষটির ডাক পড়ে। ধীরে ধীরে তাঁর দক্ষতা আর বিশেষ গুণ হিসেবে দেখা হয় না; বরং সেটিই সবার কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়।
এভাবে একসময় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে ওই মানুষটি তাঁর বর্তমান পজিশনে এতটাই অপরিহার্য হয়ে ওঠেন, বসেরা তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ার কথা আর চিন্তা করেন না। কারণ, এই পজিশনেই তাঁকে দিয়ে প্রতিষ্ঠানের লাভ হচ্ছে।
কেন দক্ষ কর্মীরাই এই ফাঁদে পড়েন
মজার বিষয় হলো অনেক সময় দক্ষ কর্মীরাই না বুঝে এই চক্রকে আরও শক্তিশালী করেন। তাঁরা কঠিন সমস্যা সমাধান করতে ভালোবাসেন। এ কাজেই তাঁদের আনন্দ। তাই কেউ সমস্যা সমাধানে সহায়তা চাইলে তিনি আর ‘না’ বলতে পারেন না। এমনকি নিজের কাজের চাপ বাড়লেও অন্যের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।
এ ছাড়া এসব মানুষ বিশ্বাস করেন, ভালো কাজের মূল্য একদিন না একদিন সবাই বুঝবেই। তাই নিজের সাফল্যের কথা খুব একটা বলেন না, নিজের পক্ষে কথা বলতেও সংকোচ বোধ করেন।
কীভাবে বুঝবেন আপনি এই মূল্য দিচ্ছেন
সমস্যা হলেই প্রথম ফোনটি আপনার কাছেই আসে। প্রায় সব সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব আপনাকেই দেওয়া হয়; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বৈঠকে আপনার উপস্থিতি খুব কমই থাকে।
• কাজ বাড়ছে, কিন্তু ক্ষমতা বাড়ছে না: দিন দিন আপনার দায়িত্ব বাড়ছে; কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা কর্তৃত্ব সেই অনুপাতে বাড়ছে না। পদোন্নতিও হচ্ছে না।
• প্রশংসা পাচ্ছেন, কিন্তু ক্যারিয়ার এগোচ্ছে না: বসেরা বলছেন, আপনি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষ; কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠাটাই উল্টো পদোন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, প্রতিষ্ঠান আপনাকে বর্তমান জায়গা থেকে সরাতে চায় না।
• আপনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন, কিন্তু দৃশ্যমান কাজ নয়: আপনি সংকট সামলাচ্ছেন, সমস্যার সমাধান করছেন, অন্যদের কাজ সহজ করে দিচ্ছেন। অথচ নেতৃত্বের সামনে সেই কাজ উপস্থাপন করছেন অন্য কেউ, সম্পর্ক তৈরি করছেন অন্য কেউ, ভবিষ্যতের কৌশল নির্ধারণেও থাকছেন অন্য কেউ।
শুধু দক্ষ হলেই হবে না
দক্ষতা একজন মানুষের সুনাম গড়ে তোলে। এমন কর্মী কে না চায়, যার ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়? কিন্তু শুধু দক্ষ হওয়াই ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। আসল লক্ষ্য কম নির্ভরযোগ্য হওয়া নয়; বরং এমনভাবে নিজের কাজের মূল্য তুলে ধরা, যাতে সেই নির্ভরযোগ্যতা আপনাকে একই জায়গায় আটকে না রেখে নতুন সুযোগের দরজা খুলে দেয়।
বাস্তবতা হলো মানুষ শুধু ভালো কাজ করার জন্য পদোন্নতি পায় না; তারা তখনই এগিয়ে যায়, যখন প্রতিষ্ঠানের অন্যরা বুঝতে পারে—এই সাফল্যের পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি এবং সেই অবদান প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে