গ্র্যাজুয়েট হয়েও চাকরি মিলছে না? কী করবেন

চাকরির জন্য বাজারে প্রতিযোগিতা এত বেশি যে সদ্য গ্র্যাজুয়েটরা হিমশিম খাচ্ছেছবি: এআই/বন্ধুসভা

বাংলাদেশে প্রতিবছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে। তাঁরা প্রত্যাশা করে একটি সম্মানজনক চাকরি, একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—চাকরির জন্য বাজারে প্রতিযোগিতা এত বেশি যে সদ্য গ্র্যাজুয়েটরা হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে নিয়োগদাতারা বলছেন, যথাযথ দক্ষতাসম্পন্ন প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।

এই বিপরীতধর্মী বাস্তবতা একটি গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, গ্র্যাজুয়েটরা আসলে কী জানে না? আর চাকরির বাজার কী চাইছে?

বাংলাদেশে চাকরির বাজারের বাস্তব চিত্র
বর্তমানে চাকরির বাজারে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা যত, তার তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপাকে পড়ে সদ্য গ্র্যাজুয়েট তরুণেরা; যাঁদের কাজের অভিজ্ঞতা নেই, বাস্তব দক্ষতা সীমিত, আবার চাকরির জন্য প্রস্তুতিও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ নয়।

একই সময়ে মানবসম্পদ বিভাগ বা নিয়োগকারী সংস্থাগুলো বলছে, তাঁরা প্রার্থী পাচ্ছেন, কিন্তু যোগ্য প্রার্থী পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর শত শত সিভি আসছে, কিন্তু সাক্ষাৎকারে ডাক দেওয়ার মতো উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।

গ্র্যাজুয়েটদের মূল চ্যালেঞ্জ
১. সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব: অনেকেই জানেন না কোথা থেকে শুরু করতে হবে। কীভাবে সিভি বানাতে হয়, কোন ধরনের চাকরির জন্য কী ধরনের দক্ষতা দরকার—এমন মৌলিক বিষয়গুলো নিয়েও তাঁরা দ্বিধায় থাকেন। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সাপোর্টও নেই।

২. ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি: বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখানো থিওরি বা একাডেমিক জ্ঞান বাস্তব কর্মক্ষেত্রে সব সময় প্রয়োগযোগ্য হয় না। আইটি, ডিজিটাল মার্কেটিং, ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন, প্রেজেন্টেশন, ডেটা অ্যানালাইসিস—এ ধরনের দক্ষতাচর্চার সুযোগ শিক্ষার্থীরা খুব কমই পান।

৩. ইন্টার্নশিপ বা বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব: চাকরিদাতারা এমন প্রার্থী খোঁজেন, যাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীই ইন্টার্নশিপ করে না বা যেভাবে করতে হয়, সেভাবে মূল্যায়ন করে না। ফলে সিভিতে দেখানোর মতো কোনো কাজের অভিজ্ঞতা রাখতে পারে না।

৪. পরিকল্পনার অভাব: ‘চাকরি করব’ এই ইচ্ছা থাকলেও কী ধরনের কাজ, কোন ক্ষেত্র, কোথায় আগ্রহ বা দক্ষতা আছে—এসব অনেক সদ্য গ্র্যাজুয়েট জানেন না। ফলে তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের চাকরিতে আবেদন করে, কিন্তু সাফল্য পায় না।

৫. অনলাইন উপস্থিতি ও প্রফেশনাল ব্র্যান্ডিং দুর্বল: বর্তমানে লিংডইনের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রোফাইল থাকা এবং সেখানে অ্যাকটিভ থাকা জরুরি। কিন্তু অনেক গ্র্যাজুয়েটই এগুলোর গুরুত্ব বোঝেন না। ফলে তাঁরা সম্ভাব্য নিয়োগকারীদের নজরে আসতে ব্যর্থ হন।

কীভাবে সদ্য গ্র্যাজুয়েটরা নিজেকে প্রস্তুত করবেন
১. নিজের আগ্রহ ও দক্ষতা চিহ্নিত করুন: প্রথম ধাপ হচ্ছে, নিজের আগ্রহ, পছন্দ ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা। আপনি কি ডেটা নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন, নাকি লেখালেখি করতে? টিমে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, নাকি স্বাধীনভাবে? এগুলো বুঝে ক্যারিয়ার পরিকল্পনা শুরু করতে হবে।

২. প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করুন: বর্তমান চাকরির বাজারে যেসব দক্ষতা বেশি চাওয়া হয়—
কম্পিউটার ও ডিজিটাল দক্ষতা: মাইক্রোসফট এক্সেল, গুগল ওয়ার্কপ্লেস, পাওয়াপয়েন্ট ইত্যাদি।
যোগাযোগ দক্ষতা: ইংরেজি ও বাংলায় সাবলীলভাবে কথা বলা ও লিখতে পারা
ডিজিটাল মার্কেটিং ও সোশ্যাল মিডিয়া পরিচালনা
ডেটা অ্যানালাইসিস ও ভিজ্যুয়ালাইজেশন (Excel, Power BI, Tableau)
গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং (যদি মিডিয়া ফিল্ডে আগ্রহ থাকে)।

এই দক্ষতাগুলো শেখার জন্য রয়েছে অনেক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। যেমন—
কোর্সেরা (Coursera)
লিংকডইন লার্নিং (LinkedIn Learning)
স্কিলশেয়ার (Skillshare)
টেন মিনিট স্কুল
বিডিজবস ট্রেইনিং
এনএসডিএ (জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)

৩. ইন্টার্নশিপ বা ভলান্টারি কাজ করুন: ইন্টার্নশিপ করতে পারলে একদিকে যেমন বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়, তেমনি ভবিষ্যতে স্থায়ী চাকরির সম্ভাবনাও তৈরি হয়। এ ছাড়া ভলান্টারি কাজ, ক্লাব অ্যাকটিভিটি বা স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনে কাজ করার অভিজ্ঞতাও সিভিতে বড় ভূমিকা রাখে।

৪. সিভি ও ইন্টারভিউতে পেশাদার হোন
একটি সুন্দর, আধুনিক এবং সংশ্লিষ্ট চাকরির উপযোগী সিভি তৈরি করুন
ইন্টারভিউয়ের জন্য প্রস্তুতি নিন—মক ইন্টারভিউ দিন, ইউটিউবে ইন্টারভিউ প্রশ্ন-উত্তর দেখুন
প্রফেশনাল ই–মেইল আইডি ব্যবহার করুন

৫. ক্যারিয়ার সেমিনার ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করুন: দেশে এখন প্রায় প্রতি মাসেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ক্যারিয়ার ফেয়ার, ওয়ার্কশপ বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেমিনার হয়। বিডিজবস, প্রথম আলো জবস, বিওয়াইএলসি (BYLC), ইয়াং বাংলা ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

নিয়োগদাতারা কী চান
মানবসম্পদ কর্মকর্তারা সাধারণত একজন গ্র্যাজুয়েট থেকে যেসব বিষয় আশা করেন—
শেখার আগ্রহ
ইতিবাচক মনোভাব
সময়ানুবর্তিতা ও পেশাগত আচরণ
মৌলিক সফট স্কিল: যোগাযোগ, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান
প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা

গ্র্যাজুয়েটদের উচিত এগুলো নিজের মধ্যে তৈরি করা, যাতে প্রথম সাক্ষাৎকারেই একটি পজিটিভ ইমপ্রেশন তৈরি হয়।

প্রয়োজন সচেতনতা ও মানসিক প্রস্তুতি
চাকরির পথ সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। প্রতিযোগিতা যতই থাকুক, যাঁরা সঠিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে, তাঁদের জন্য সুযোগ সব সময় থাকে। এ জন্য দরকার—
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
শেখার অভ্যাস
নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস
ব্যর্থতা থেকে শেখার মানসিকতা

মনে রাখবেন, বাংলাদেশে সদ্য গ্র্যাজুয়েটদের চাকরি না পাওয়ার প্রধান কারণ শুধু কাজের সুযোগের অভাব নয়, বরং সঠিক প্রস্তুতির অভাব। যোগ্যতা মানে কেবল সার্টিফিকেট নয়, বাস্তব দক্ষতা, মানসিক প্রস্তুতি ও সঠিক দিকনির্দেশনার সমন্বয়। তরুণদের উচিত এখনই নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তোলা, বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া এবং সচেতনভাবে ক্যারিয়ার গঠন করা।

লেখক: প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা, বিক্রয় ডটকম