‘আঁর কোত্তা বেশি সুন্দর’—এমন আবেগাপ্লুত উচ্ছ্বাসে ছয় বছরের বাবাহারা শরিফ যখন আনন্দিত হয় এই ভেবে যে তার ঈদের দিনটি বন্ধুসভার দেওয়া নতুন জামায় আনন্দঘন হবে, তখনই বন্ধুসভার সহমর্মিতার ঈদের উদ্দেশ্য সার্থকতা লাভ করে।
জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের আহ্বানে ‘সহমর্মিতার ঈদ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চার ধাপে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নতুন জামা ও তাদের পরিবারকে ঈদের খাদ্যসামগ্রী উপহার দিয়েছে নোয়াখালী বন্ধুসভা।
৭ মার্চ প্রথম ধাপে ঈদের উপহার নিয়ে বন্ধুরা পৌঁছে যান নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। চরের ৪২ জন শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয় ঈদ উপহার। নতুন জামা পেয়ে সাত বছরের মিলি বলে, ‘আব্বা অন্নো কিছু কিনি দেয় নো। আন্নেগো দিইন্না কোত্তা ইজা আঁর ঈদের জামা।’
এমন সময় একজন অভিভাবক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আন্নেগো লাই মেলা দোয়া করি। আঙ্গো হোলাহাইনের লাই এতো দূরেত্তুন কোত্তা লোই আইছেন।’
এ সময় শিশু ও অভিভাবকদের উদ্দেশে বন্ধুসভার উপদেষ্টা সুমন নূর বলেন, ‘আমরা এত দূর ছুটে এসেছি শুধু আপনাদের মুখে হাসি দেখব বলে।’
দ্বিতীয় ধাপে ১২ মার্চ বন্ধুরা ছুটে যান জেলার কবিরহাট উপজেলার নেওয়াজপুরের ধর্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে ৩৭ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয় ঈদের নতুন জামা। ‘মা কোইসে কিচ্ছু কিনতো হাইত্তো নো এবার। ওন তো এগ্গা নতুন কোত্তা হাই গেসি—কী মজা!’ নতুন জামা পেয়ে সাত বছরের সুরাইয়া পাশের বান্ধবীর সঙ্গে কথোপকথনে এভাবেই মেতে ওঠে।
এ সময় বন্ধুসভার উপদেষ্টা লায়লা পারভীন বর্তমান প্রেক্ষাপটের আলোকে মেয়েশিশুদের নিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন এবং শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে আলোকপাত করেন। সাধারণ সম্পাদক সানি তামজীদ বলেন, ‘আমরা চাই এই সমাজে কেউ পিছিয়ে না থাকুক। তোমাদের সবাইকে নিয়ে আমরা ভালো থাকতে চাই। সবার ঈদ আনন্দময় আর উৎসবমুখর হোক।’
তৃতীয় ধাপে ১৭ মার্চ জেলার সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর খালপাড় এলাকায় শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ঈদের জামা বিতরণ করেন নোয়াখালী বন্ধুসভার বন্ধুরা। এই পর্বে ৩৫ জন শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয় ঈদ উপহার।
নোয়াখালী বন্ধুসভার সভাপতি আসিফ আহমেদ বলেন, ‘বন্ধুসভা সব সময় আমাদের মানবিক মানুষ হতে শেখায়। বন্ধুসভার বন্ধুরা সাধ্য অনুযায়ী যতগুলো মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা যায়, সেটা প্রতি ঈদে করে আসছেন। এবারও ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের হাতে ঈদের উপহার তুলে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত।’
নোয়াখালী বন্ধুসভার সহমর্মিতার ঈদের এ বছরের সমন্বয়ক ছিলেন সাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রোজা রেখে এত ছোটাছুটি করে এসে যখন তোমাদের হাসিমুখটা দেখি, সব কষ্ট তখন সার্থকতা লাভ করে। আমরা দূর থেকে দূরান্তে ছুটে চলি এই শিশুদের মুখে হাসি ফোটাব বলে।’
শিশুদের মধ্যে রঙিন জামা বিতরণের পাশাপাশি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা, কবিরহাট উপজেলা ও সদর উপজেলার ৩০টি পরিবারের হাতে সেমাই, দুধ ও চিনির প্যাকেট পৌঁছে দেন বন্ধুরা। বিচ্ছিন্নভাবে পথশিশুদের মাঝেও ঈদ উপহার বিতরণ করা হয়।
সবশেষে চতুর্থ ধাপে আগামীকাল ১৯ মার্চ সোনাইমুড়ী উপজেলার ভোরের বাজারে ৩৫টি শিশু এবং বেশ কয়েকটি পরিবারে ঈদ উপহারসামগ্রী পৌঁছে দিবেন বন্ধুরা।
উপহারসামগ্রী ক্রয়ে প্রতিবারের মতো অর্থ প্রদান করে সহযোগিতা করেন নোয়াখালী বন্ধুসভার বন্ধু, উপদেষ্টা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও শুভানুধ্যায়ীরা।
ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সহমর্মিতার ঈদ কার্যক্রমে ছিলেন উপদেষ্টা নিলয় মিলন, মাহফুজের রহমান, সহসভাপতি মো. শিমুল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নয়ন চন্দ্র কুরী, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক ফাতেমা কানিজ, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক সৌভিক দাস, প্রশিক্ষণ সম্পাদক নজরুল ইসলামসহ অন্য বন্ধুরা।
অর্থ সম্পাদক, নোয়াখালী বন্ধুসভা