কিশোর গ্যাং ও মাদক থেকে নিজেদের দূরে রাখতে হবে

জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান
ছবি: বন্ধুসভা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো সংবর্ধনা উৎসব। শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রথম আলোর উদ্যোগে এ আয়োজনে সহায়তা করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগানে ২৫ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজ মাঠে এ উৎসব হয়।

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। শুরুতে বন্ধুসভার সদস্যরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। একই সুরে গেয়ে ওঠেন সহস্রাধিক শিক্ষার্থী, অতিথি ও অভিভাবকেরা। এর আগেই মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয় শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও উপহার।

শিক্ষার্থীদের আনন্দ ও শেখার সুযোগ তৈরি করতে রাখা হয় বিভিন্ন ধরনের গেমস। ছিল ৩৬০ ঘুরে ছবি তোলা, সেলফি বুথ এবং প্রথম আলোর এক্সপেরিয়েন্স জোনে খেলায় অংশ নিয়ে বিজ্ঞান ও জ্ঞানভিত্তিক ম্যাগাজিন ও শিক্ষাসামগ্রী জিতে নেওয়ার সুযোগ। ছিল আইসক্রিমও। আয়োজনজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

মুহূর্তকে ধরে রাখতে সহপাঠীদের সঙ্গে সেলফি
ছবি: বন্ধুসভা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার কর্মযজ্ঞ
উৎসবের আগের দিন বিকেল থেকে শুরু হয় বন্ধুদের দৌড়ঝাঁপ। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে শিক্ষার্থীদের নাশতা প্যাকেট প্রস্তুত করা। রাতে চলে ডেকোরেশন ও ইভেন্টের কাজ। বন্ধুরা পালাক্রমে এসব কাজে সহায়তা করেন। উৎসবের দিন সকাল থেকেই ভেন্যুতে বন্ধুদের দায়িত্বশীল ও সুশৃঙ্খল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

জেলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আট শতাধিক কৃতী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের আনন্দমুখর পদচারণে মুহূর্তেই মুখর হয়ে ওঠে কলেজ প্রাঙ্গণ। এত বড় জমায়েত সামলাতে বন্ধুসভার বন্ধুরা নির্দিষ্ট উপকমিটিতে বিভক্ত হয়ে শৃঙ্খলা রক্ষা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভ্যর্থনা জানানো, নিবন্ধন ডেস্ক নিখুঁতভাবে পরিচালনা, অনুষ্ঠানস্থলে প্যান্ডেলের নিচে আসন বণ্টন এবং শিক্ষার্থীদের উপহারসামগ্রী সুবিন্যস্ত রাখার কাজে বন্ধুরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। চত্বরে স্থাপিত ‘প্রথম আলো এক্সপেরিয়েন্স জোন’, ফটোফ্রেম এবং ডিজিটাল বুথে শিক্ষার্থীদের আনন্দঘন মুহূর্তে দিকনির্দেশনা ও সার্বিক সহায়তা করেন।

বন্ধু চন্দ্রিমা বণিকের নৃত্য পরিবেশনা
ছবি: বন্ধুসভা

অতিথিদের আলোচনা ও দিকনির্দেশনা
শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠানো প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের চিঠি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শাহাদৎ হোসেন শুভেচ্ছা বক্তব্যে পড়ে শোনান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার সভাপতি শাহজাহান মিয়া, সাংস্কৃতিক সম্পাদক নাজরীন আক্তার ও বন্ধু ইসরাত জাহানের সঞ্চালনায় অতিথিরা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্র তোমাদের জন্য অনেক কিছু করেছে। রাষ্ট্রের প্রতিও তোমাদের দায়িত্ব রয়েছে। দেশকে সোনার বাংলায় গড়তে হবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘তোমাদের পথচলা শুরু। তোমাদের সাফল্যে গর্বিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এই অর্জনকে ধরে রাখতে হবে। এসএসসির মতো এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেলে সফলতা সার্থক হবে। দেশকে পরিবর্তন করতে হবে। কিশোর গ্যাং ও মাদক থেকে নিজেদের দূরে রাখতে হবে।’

ফটো বুথে মেয়ের ছবি তুলে দিচ্ছেন এক অভিভাবক
ছবি: বন্ধুসভা
সাংস্কৃতিক পর্বে বন্ধুদের নৃত্য পরিবেশনা
ছবি: বন্ধুসভা

স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরতে হবে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের উদ্যোক্তা পরিচালক শাহীন মৃধা বলেন, ‘তোমরা লড়াকু সৈনিক, লড়তে জানো। ফলাফল দিয়ে তা প্রমাণ করেছ। প্রথম বলেই সিক্স মেরে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছ। এই খেলা অব্যাহত রাখতে হবে। অনেক দূর যেতে হবে। স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরতে হবে, যেতে হবে বহুদূর। সীমানা ভাঙার সক্ষমতা জানতে হবে। প্রথম আলো নিয়মিত পড়বে। কারণ, প্রথম আলোর প্রতিটি পাতা একেকটি গল্প, অনুচ্ছেদ।’

আইডিয়াল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হারুন অর রশিদ বলেন, ‘প্রথম আলো মানুষের কল্যাণে কাজ করে। প্রথম আলো শুধু একটি পত্রিকা নয়, এটি একটি প্রতিষ্ঠান। এটি মানবতার কল্যাণে ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করে। এভাবে সফলতা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলার শপথ পড়ান প্রথম আলোর হেড অব কালচারাল এন্টারটেইনমেন্ট কবির বকুল। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই পড়াশোনা করব, দেশের জন্য কাজ করব ও ভালো মানুষ হব। আজকে যাঁরা (শিক্ষক) সুন্দর সুন্দর কথা বলে গেলেন, তাঁদের স্বপ্নটা এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। এই স্বপ্ন দেখতে গিয়ে অনেকে খোঁচট খেয়েছেন, কেউ ব্যর্থ হয়েছেন কিন্তু থেমে যাননি। তাঁরা জানতেন পরিশ্রম করলে সাফল্য আসবেই। পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।’

শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস
ছবি: বন্ধুসভা
সাংস্কৃতিক পর্বে নৃত্য পরিবেশনা
ছবি: বন্ধুসভা

সাফল্যের জন্য শিক্ষক ও মা-বাবার প্রতি শিক্ষার্থীদের কৃতজ্ঞতা
সরাইল উপজেলার শাহাজাদাপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলে, ‘আমার মা-বাবা নিরক্ষর, পড়াশোনা জানেন না। বাবা-মায়ের সেই সক্ষমতা ছিল না যে আমাকে পড়া দিয়ে পড়া আদায় করবে। কিন্তু আমি যখন রাত জেগে পড়াশোনা করতাম, তাঁরা আমার পাশে বসে থাকতেন। আমি এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁদের সম্মান ও স্মরণ করছি।’

কৃতী শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলে, ‘স্বপ্নের ডানায় পথ চলে। এই অর্জনের পেছনে লুকিয়ে আছে গল্প-টেবিল ও রাত জাগা। শিক্ষক ও বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা। জিপিএ-৫ পাওয়াই শেষ অধ্যায় না। ভালো মানুষ হতে হবে।’

গভর্মেন্ট মডেল গালর্স হাইস্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী তাশফিয়া তাসনিম, সৈয়দা কানিজ জাহান, ইসরাত জাহান, লামিয়া আমান্তু রহমান, মহুনা রায় ও তানহা আক্তার জানায় তাদের অনুভূতি।

শিক্ষার্থীদের প্রাপ্তি ও মেধার স্বীকৃতি
শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় সম্মাননা ক্রেস্ট, ডিজিটাল সার্টিফিকেট, বিনা মূল্যে এআই কোর্স এবং কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা পত্রিকার ছয় মাসের সাবস্ক্রিপশনে বিশেষ ছাড়।

অনুষ্ঠান শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার বন্ধুরা
ছবি: বন্ধুসভা
সাংস্কৃতিক পর্বে নৃত্য পরিবেশনা
ছবি: বন্ধুসভা

বন্ধুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা
অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার বন্ধুদের নিজেদের পরিবেশনায় মঞ্চস্থ হয় আকর্ষণীয় নৃত্য। বন্ধু চন্দ্রিমা বণিক ‘মুক্তির মন্দিরে সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান’ গানে নৃত্য পরিবেশন করেন। ‘জলে গিয়াছিলাম সই, এগো কালা কাজলের পাখি দেইখা আইলাম কই’ গানে দ্বৈত নৃত্যে চন্দ্রিমা বণিক ও তিলোত্তমা সরকার; ‘পিন্ডারে পলাশে বন’ গানে রিতিমা শর্মা; ও ‘আলগা করো খোঁপারও বাঁধন’ গানে নিষমী সুলতানা নৃত্য পরিবেশন করেন।

ঢাকার সংগীতশিল্পী অনিক সূত্রধর গান গেয়ে শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করেন। শেষে অনলাইনে আয়োজিত কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

বন্ধুসভার বন্ধুদের স্বেচ্ছাশ্রম, পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় আয়োজনের নানা কাজ। উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক ফাহমিদা আক্তার, সহসভাপতি শারমিন হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলিয়া মাহবুব ও ফৌজিয়া হক, সাংগঠনিক সম্পাদক সাদ হোসেন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক আল মামুন, অর্থ সম্পাদক আফসানা নিশাত, প্রশিক্ষণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক ইসরাত জাহান, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক কৃষ্ণ মৈশান, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, বন্ধু মাইনুদ্দীন রুবেল ও আরেফিন শোভন, সাবেক সভাপতি লিমন ভূঁইয়া, বন্ধু রানা রক্ষিত, তানিয়া, মোনা, আঁখি, মারিয়া, তাহসিন মিম, তনয় মোল্লা, শেখ ওয়াফি, পুলক দাস, কামাল হোসেনসহ অনেকে।

দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভা