দেশটাকে গড়ে তোলার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে নিতে হবে

ঠাকুরগাঁওয়ে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড-২০২৬’–এ বিজয়ী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতিথিরাছবি: বন্ধুসভা

‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের পরিচয়। এই পরিচয়টাকে আমাদের ভেতরে ধারণ করতে হবে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা আস্তে আস্তে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবেন। এরপর দেশটাকে গড়ে তোলার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে নিতে হবে। সে জন্য মুক্তিযুদ্ধ কী, কীভাবে সংগঠিত হয়েছে—সে সম্পর্কে আমাদের জানা দরকার। মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিয়ে দেশটার অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাকে অবজ্ঞা করলে দেশ সামনে আগাতে পারে না।’

ঠাকুরগাঁওয়ে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠানে অতিথিরা এ কথা বলেন। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে ৩১ মার্চ শহরের কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের হলরুমে এটির আয়োজন করেছে ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভা।

অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে আগেভাগেই ভেন্যুতে চলে আসে সিএম আইয়ুব বালিকা বিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষার্থী। তাদের একজন হুমাইয়া আকতার। হুমাইয়া বলে, ‘আমি গণিত, সায়েন্স, ফিজিকসসহ নানা অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ এই প্রথম। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনাও খুব একটা নেই। অনেকটা কৌতূহল নিয়ে এখানে আগেভাগে চলে এসেছি।’

আর কে স্টেট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন বলে, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য জানতে চাই। তাই এখানে ছুটে এসেছি।’

সকাল সোয়া ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। উদ্বোধন করেন কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোতালেব হোসেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রামের ফসল এ দেশের স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালে যাঁরা আমাদের মুক্তির জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের আমরা কখনোই ভুলব না। তাঁদের আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখব। বন্ধুসভাকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন একটি আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানাই।’

ঠাকুরগাঁওয়ে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড-২০২৬’–এ বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা
ছবি: বন্ধুসভা

উদ্বোধন শেষে অলিম্পিয়াডে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ৩০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত ২০ মিনিটের এ পরীক্ষা শেষে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন।

ফলাফল ঘোষণার আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাদ শাহামাদের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি মজিবর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘এ সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আয়োজন বন্ধুসভার একটি সাহসী উদ্যোগ। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে আমাদের ভয় পেলে চলবে না। বুকে সাহস নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে হবে।’

লেখক ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ফারজানা হক স্বর্ণা বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ে ৪৬টি বধ্যভূমি রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে ৪০টিই অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। সেসব বধ্যভূমি সংরক্ষণে কাজ করতে হবে। ২৩ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও জাটিভাঙা গণহত্যা দিবস। জাটিভাঙা গণহত্যা উত্তরবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বড় গণহত্যা। কিন্তু কষ্টের বিষয়, এই গণহত্যা নিয়ে আমাদের কোনো আয়োজন নেই। এই গণহত্যা নিয়ে একটা আলোচনা সভার আয়োজন করার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কী নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। আমাদের সারা দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জনার পাশাপাশি নিজ জেলার ইতিহাসটাও ভালো করে জানতে হবে। শুধু পাঠ্যবই পড়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানলে হবে না। পাঠ্যবইয়ের বাইরের অনেক বই পড়তে হবে। আর মুক্তিযুদ্ধকে ভুলে গেলে চলবে না। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্ব।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মুক্তিযোদ্ধা জেলা কমান্ডের সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। এই স্বাধীনতা তোমাদের রক্ষা করতে হবে। আর স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে তুলতে হবে। এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানা খুবই জরুরি। কারণ, এখন দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চলছে। আমরা নিজেরা শুধু মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানলে চলবে না, অন্যদেরও জানানোর দায়িত্ব নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানা থাকলে আমাদের কেউ বিভ্রান্ত করতে পারবে না।’

লেখক ও গবেষক অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, ‘আমি যখন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থাকি, তখন গৌরবে স্পন্দিত হই। নতুন প্রজন্ম হয়তো এটা বুঝবে না। আসলে আমরাই তোমাদের বোঝাতে পারিনি। আজ আমার কষ্ট হয় একাত্তরে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও রণাঙ্গনে যুদ্ধ করতে পারিনি। তবে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করতে না পারলেও, প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম।’

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়
ছবি: বন্ধুসভা

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক মো. নুর করিম বলেন, ‘এই দেশ এমনি এমনি স্বাধীন হয়নি। অনেক ত্যাগ–তিতিক্ষা, ৩০ লাখ শহীদের বুকের তাজা রক্ত এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা। কিন্তু যখন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কেউ বিরূপ ভাব প্রকাশ করেন, তখন কষ্ট হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে দেখার চেষ্টা চলছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাব। আর যখন আমরা থাকব না, তখন নতুন প্রজন্মকে এই দায়িত্ব নিতে হবে।’

অলিম্পিয়াডে শহরের নয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট ১৭৬ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. জাওয়াদ ও আদিত্য দেবনাথ, কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার ইসলাম ও ফারহান সাদিক, ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী স্বর্ণ রায় ও বর্ণ রায়, সি এম আইয়ুব বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনন্যা রানী দেবনাথ ও ইকো পাঠশালা অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সামিন ইমাসার।

অনুষ্ঠান শেষে বিজয়ীদের হাতে বই তুলে দেন অতিথিরা। সমাপনী বক্তব্য দেন ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভার সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন।

সাধারণ সম্পাদক, ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভা