জ্বলে উঠল প্রজেক্টরের নীলচে আলো, রুপালি পর্দায় ভেসে উঠল একাত্তরের উত্তাল দিনগুলো। এক মায়ের আত্মত্যাগ আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা বাংলার মাটি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই দৃশ্যে চোখ আটকে ছিল একদল শিশুর, যাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ শুধুই পাঠ্যবইয়ের অক্ষরমাত্র।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই অবিনাশী চেতনা আর ত্যাগের গল্প নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে ছড়িয়ে দিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে নোয়াখালী বন্ধুসভা। ৩০ অক্টোবর নোয়াখালীর বার্লিংটন মোড়ে ইয়ুথ ভলান্টিয়ার একাডেমিতে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
বন্ধুরা জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। যাঁদের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা, তাঁদের স্মরণ করা এবং সেই ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।’
অনুষ্ঠানে নোয়াখালী বন্ধুসভার বন্ধুদের পাশাপাশি ইয়ুথ ভলান্টিয়ার একাডেমির তরুণ সদস্য এবং প্রতিষ্ঠানটির ‘১০০ টাকায় শিক্ষা’ প্রকল্পের সুবিধাভোগী শিশুরা অংশ নেয়।
আয়োজনে প্রদর্শিত হয় প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’। উপন্যাসটি ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় এক মায়ের অসামান্য আত্মত্যাগ ও মাতৃত্বের গভীর বেদনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রটি উপস্থিত দর্শকদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পর মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় উঠে আসে স্বাধীনতার জন্য সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা এবং স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে অসংখ্য মানুষের অবদানের কথা।
নোয়াখালী বন্ধুসভার সভাপতি আসিফ আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুধু আমাদের ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার ভিত্তি। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এ দেশের মানুষ যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়। সেই চেতনা ধারণ করে আমাদের দেশপ্রেম, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করতে হবে।’
ইয়ুথ ভলান্টিয়ার একাডেমির সদস্য সুলতানুল আরেফিন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; আমাদের চিন্তা, চর্চা ও জীবনবোধের অংশ করে তুলতে হবে। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করা এবং বৈষম্য, অন্যায় ও মানবিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা।’
সাধারণ সম্পাদক সানি তামজিদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কবিতা আবৃত্তিতে আড্ডাটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কবিতার পঙ্ক্তিতে উঠে আসে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন।
সহসভাপতি আবদুর রহিম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ আর আত্মদান আমাদের আজীবন ঋণী করে রেখেছে। সেই ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো একটি শোষণমুক্ত, মানবিক ও সুন্দর দেশ গড়ে তোলা। আমি আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গর্ব করি।’
আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নয়ন চন্দ্র কুরি, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক শান্ত চন্দ্র দে, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক নাফিস আহমেদ, কার্যনির্বাহী সদস্য রুমাইয়া সুলতানা, সানজিদা মাধবী, বন্ধু মেহেদী হাসান, মিহানুর রহমান, মাহির আজিজসহ বন্ধুসভা ও ইয়ুথ ভলান্টিয়ার একাডেমির আরও অনেক সদস্য।
অর্থ সম্পাদক, নোয়াখালী বন্ধুসভা