সিলেটের ১০ চায়ের টঙে ১০ হাজার কাগজের কাপ দিল বন্ধুসভা

সিলেট বন্ধুসভার একটি ভালো কাজছবি: বন্ধুসভা

বিকেল পাঁচটা পেরোলেই জমে ওঠে সিলেটের কিন ব্রিজ এলাকার চায়ের আড্ডা। চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত সিলেটে চায়ের দোকানগুলোতে রয়েছে নানা স্বাদের চা। কারও পছন্দ হরলিক্স চা, কারও টক-ঝাল-মিষ্টি স্বাদের বুলেট চা, আবার কারও পছন্দ লেবু–চা কিংবা সাধারণ দুধ–চা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে বন্ধুদের আড্ডা। তবে চা পরিবেশনে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের কাপের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশদূষণ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে সিলেট বন্ধুসভা।

প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সিলেট নগরের ১০টি চায়ের টঙে ১০ হাজার কাগজের কাপ বিতরণ করেছে সংগঠনটি। পাশাপাশি চা–বিক্রেতাদের কাগজের কাপ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছে।

নগরের অনেক চায়ের দোকানে গরম চা পরিবেশনের জন্য ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিকের কাপ। এসব কাপের উপাদান ও গুণমানের ওপর নির্ভর করে গরম পানীয়র সংস্পর্শে কিছু রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হতে পারে। এ ছাড়া প্লাস্টিকের তৈরি কিছু পাত্র থেকে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পানীয়তে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিলেট বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ।

প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যেমন বিসফেনল এ (বিপিএ) ও নির্দিষ্ট ধরনের থ্যালেটস শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সব প্লাস্টিকের কাপে এসব রাসায়নিক থাকে না; ঝুঁকি নির্ভর করে প্লাস্টিকের ধরন, গুণমান ও ব্যবহারের পরিস্থিতির ওপর।

দীর্ঘদিন ধরে কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকার সঙ্গে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যা এবং নির্দিষ্ট কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে কী মাত্রায় ক্ষতি করে এবং ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক কতটা—তা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাই প্লাস্টিকের কাপে গরম চা পান করলেই ক্যানসার হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশদূষণ কমাতে গরম পানীয় পরিবেশনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত মানের কাচ, সিরামিক, স্টেইনলেস স্টিল কিংবা নিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করা যেতে পারে। কাগজের কাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও খেয়াল রাখতে হবে, কাপের ভেতরের আবরণটি যেন গরম পানীয়র জন্য উপযুক্ত হয়।

সিলেট বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ।

কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি চায়ের দোকানে পাঁচ দিনের জন্য কাগজের কাপ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিক্রেতারা যেন নিজেরাই কাগজের কাপ কিনে ব্যবহার করতে পারেন, সে বিষয়ে তাঁদের উৎসাহিত করা হয়।

চা বিক্রেতা লিপি বেগম বলেন, ‘অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও দামের কারণে কাগজের কাপ কেনা সম্ভব হয় না। এই পাঁচ দিনের কাপ ব্যবহারের সময়ে যে টাকা সাশ্রয় হবে, তা জমিয়ে এখন থেকে কাগজের কাপ ব্যবহারের চেষ্টা করব।’

নগরের জেল রোড পয়েন্টের খান টি স্টলের মালিক আজাদ বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে চা বিক্রি করছি। কাগজের কাপের দাম বেশি হলেও চেষ্টা করি গ্রাহকদের কাগজের কাপে চা দিতে। এ ধরনের সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়ায় বন্ধুসভার বন্ধুদের ধন্যবাদ জানাই।’

সিলেট বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ।

কর্মসূচির অংশ হিসেবে বন্ধুসভার সদস্যরা পথচারীদের প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিক এবং পরিবেশের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করেন। পাশাপাশি ‘আমার শহর সিলেট’ লেখা কাগজের কাপ ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করেন তাঁরা।

সিলেট বন্ধুসভার পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক অম্লান রায় বলেন, ‘কাপে “আমার শহর সিলেট” লেখা মানুষকে আকৃষ্ট করবে। আমরা চাই, মানুষ সচেতন হোক এবং প্রতিদিনের চায়ের আড্ডায় প্লাস্টিকের কাপের পরিবর্তে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠুক।’

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সমরজিৎ হালদার বলেন, ‘সিলেট বন্ধুসভা নিয়মিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এবারের “একটি ভালো কাজ” কর্মসূচির লক্ষ্য চাপ্রেমীদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা। একজন মানুষ দিনে গড়ে দুই থেকে তিন কাপ চা পান করেন, যার বড় একটি অংশ পান করা হয় বাইরের দোকানে। তাই চায়ের দোকানগুলোতে প্লাস্টিকের কাপের ব্যবহার কমাতে আমরা কাজ করছি।’

নগরের কিন ব্রিজ এলাকা থেকে শুরু করে রিকাবীবাজার, চৌহাট্টা, বন্দরবাজার ও জেল রোড এলাকার মোট ১০টি চায়ের টঙে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সিলেট বন্ধুসভার সভাপতি দেব রায় সৌমেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ফয়সাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সমরজিৎ হালদার, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক অম্লান রায়, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক সুমন দাশসহ সংগঠনের অন্য সদস্যরা।

সভাপতি, সিলেট বন্ধুসভা