তারুণ্যের ধমনিতে একাত্তরের স্পন্দন

‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে শিক্ষার্থীদের শপথ পাঠ। বগুড়া বন্ধুসভার আয়োজনে শহরের বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অডিটোরিয়ামে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড
ছবি: বন্ধুসভা

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?

কবি শামসুর রাহমানের এই পঙ্‌ক্তিমালা যখন কোনো কিশোরের কণ্ঠে শুনি, মনে হয় একাত্তর কোনো দূরের অতীত নয়; একাত্তর আমাদের ধমনিতে বহমান জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। তবু শঙ্কা হয়, যে তরুণ প্রজন্ম আগামীর বাংলাদেশ—তারা কি জানে এই মানচিত্রের প্রতিটি ইঞ্চিতে লেগে থাকা রক্তঋণের গল্প? তারা কি চেনে সেইসব বীরকে, যাঁদের রক্ত আর বিসর্জনের ডালায় নির্মিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতার ভিত? এই শঙ্কা মোচনের দায়বোধ থেকেই আমরা দেশজুড়ে আয়োজন করেছি প্রথম আলো বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার আয়োজনে আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে অলিম্পিয়াডের কুইজ
ছবি: বন্ধুসভা

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই অলিম্পিয়াড ছিল স্বল্প সময়ের উদ্যোগে নেওয়া দেশব্যাপী এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। মার্চের শুরুতেই ঘোষণা দিলেও টানা বন্ধ আর ঈদের ছুটিতে দিন গুনে মাত্র দশ দিনে সারা দেশের ৭৫টি বন্ধুসভা এই অলিম্পিয়াড আয়োজন করেছে। দেশের ৬৪ জেলাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়োজনে অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ হাজারের বেশি তরুণ শিক্ষার্থী। মূল উদ্দেশ্য ছিল পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মানবিক ও বীরত্বগাথা তরুণদের হৃদয়ে গেঁথে দেওয়া; মুক্তিযুদ্ধের অবিচল চেতনায় তাঁদের মনন প্রজ্বলিত করা।

গোয়ালন্দ রাবেয়া ইদ্রিস মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে অলিম্পিয়াডে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতিথি ও বন্ধুরা
ছবি: বন্ধুসভা

মাগুরার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ওয়ালিউজ্জামান যখন শিক্ষার্থীদের সামনে ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতের স্মৃতিচারণা করছিলেন, পুরো মিলনায়তনে তখন পিনপতন নীরবতা। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধে যাই, আমাদের সামনে ছিল নিশ্চিত মৃত্যু আর পেছনে ছিল একটি পরাধীন দেশ; আমরা মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলাম; যাতে তোমরা আজ স্বাধীনভাবে নিশ্বাস নিতে পারো।’ তখন মিলনায়তনে উপস্থিত শত শত শিক্ষার্থীর চোখ ভিজে উঠেছিল। সেই অশ্রুবিন্দুগুলোই আমাদের সার্থকতা। এমন জীবন্ত ইতিহাস যখন শিক্ষার্থীরা বীরদের কাছ থেকে সরাসরি শোনে, তখন তা তাঁদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়।

সুনামগঞ্জ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে অলিম্পিয়াডের পুরস্কার বিতরণী
ছবি: বন্ধুসভা

পঞ্চগড় থেকে পটুয়াখালী, কিংবা সিলেট থেকে সাতক্ষীরা—সবখানেই ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অলিম্পিয়াডে সফেদ টুপি পরা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমের একই সারিতে পরীক্ষা দিতে দেখাটা ছিল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এটি প্রমাণ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশির এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অলিম্পিয়াড শেষে বিজয়ীদের সঙ্গে অতিথিরা
ছবি: বন্ধুসভা

অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে এক জেলার প্রশাসক যখন বলেন, ইতিহাস শুধু পড়ার বিষয় নয়, ইতিহাস লালন করার বিষয়। বন্ধুসভার বন্ধুরা ঠিক এই কাজটিই করেছেন। তাঁরা প্রতিটি জেলায় উৎসবের আমেজ তৈরি করেন। অতিথিরা যখন বলেন, ভুল ইতিহাসের ভিড়ে সত্যকে চিনে নেওয়ার এই লড়াইয়ে বন্ধুসভা আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করছে, তখন আমাদের অনুপ্রেরণা শতগুণ বেড়ে যায়।

নীলফামারী বন্ধুসভার উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড
ছবি: বন্ধুসভা

অলিম্পিয়াডের প্রশ্নপত্র এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের পেছনের দর্শন ও প্রেক্ষাপট বুঝতে পারে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩ নম্বর সেক্টরের সেকশন কমান্ডার ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহ জামাল। তিনি বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের এক অনন্য গৌরবগাথা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন প্রজন্মকে দেশ গড়ায় এগিয়ে আসতে হবে।’ চট্টগ্রামের এক খুদে শিক্ষার্থী পুরস্কার হাতে নিয়ে বলেছে, ‘এই অলিম্পিয়াড আমাকে শিখিয়েছে আমার পতাকার মর্যাদা কত বিশাল।’ যখন প্রতিটি আয়োজনের খবর পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিল আমরা কেবল একটি প্রতিযোগিতাই আয়োজন করছি না, বরং একটি সজাগ ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গড়ে তোলার শপথ নিচ্ছি।

মোংলা বন্ধুসভা অলিম্পিয়াড আয়োজন করে উপজেলার চালনা বন্দর মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে
ছবি: বন্ধুসভা

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। যদি নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে লালন করে, তাহলে এই ইতিহাস কোনোদিন মুছে ফেলা যাবে না। প্রথম আলো বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড সেই ইতিহাস লালন-প্রচেষ্টারই একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস। এটি কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, শেকল ভাঙার গান। ৭৫টি বন্ধুসভার আয়োজনে ১০ হাজার শিক্ষার্থীর কণ্ঠে যখন আমার সোনার বাংলা প্রতিধ্বনিত হয়, তখন মনে হয়, আমরা ১০ হাজার প্রদীপের শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছি। এই শিখাগুলোই একদিন অন্ধকার দূর করে একটি মেধাভিত্তিক, সুন্দর ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের আলোয় যে তারুণ্য একবার জাগ্রত হয়, তাকে আর কেউ থামিয়ে রাখতে পারে না। তবে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমাদের দায় শেষ হয়নি, বরং রক্তঋণ শোধের পালা যে কেবল শুরু হলো!

বরগুনায় অলিম্পিয়াডের কুইজ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা
ছবি: বন্ধুসভা

যেসব বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড করেছে

গাজীপুর, ভৈরব, গোপালগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, পঞ্চগড়, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, রংপুর, চকরিয়া, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, নাটোর, যশোর, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী, নীলফামারী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মৌলভীবাজার, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝালকাঠি, সিলেট, লালমনিরহাট, নরসিংদী, পাবনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ভোলা, ফেনী, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, নোয়াখালী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সাতক্ষীরা, সাভার, খুলনা, জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, কক্সবাজার, নওগাঁ, শেরপুর, গোয়ালন্দ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল, কুড়িগ্রাম, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ, ঝিনাইদহ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মোংলা, ঢাবি লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ঠাকুরগাঁও, কিশোরগঞ্জ, বরগুনা, বাগেরহাট, মেহেরপুর, বগুড়া, নড়াইল, সৈয়দপুর, সিরাজগঞ্জ, মাগুড়া, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গা, মুন্সিগঞ্জ, মুরারিচাঁদ কলেজ, রাঙামাটি, ও হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।