‘প্লিজ, তোমরা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনাকে টেনে এনো না, মেলানোর চেষ্টা কোরো না। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনার তুলনা চলে না, চলতে পারে না। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে বড় ঘটনা দেশে আগেও ঘটেনি, পরেও ঘটেনি’—১৫ মার্চ ভৈরবে অনুষ্ঠিত ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’–এ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে সবার উদ্দেশে কথাগুলো বলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভৈরব কমান্ডের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হক।
ব্লু বার্ড স্কুলে অনুষ্ঠিত এই অলিম্পিয়াডের আয়োজন করেছে ভৈরব বন্ধুসভা। এতে অংশ নেয় ভৈরবের ছয়টি স্কুল, দুটি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩১ জন শিক্ষার্থী। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে আয়োজন শুরু হয়। এরপর ২০ মিনিট ধরে চলে কুইজ প্রতিযোগিতা। শেষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ হয়। সঞ্চালনা করেন ভৈরব বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি নাহিদ হোসাইন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাফিস রহমান।
মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হক বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তেমন কিছু নেই। ক্লাসে আলোচনা কম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রত্যাশিত কাজ নেই। ফলে যা হবার তা–ই হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। অথচ স্কুল–কলেজে যদি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি বেশি বলাবলির সুযোগ থাকত, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র এমন হতো না।’ তাঁর মতে, এই মুহূর্তে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বার্তা নিয়ে কাছে যাওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
উপস্থিত নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হক তাঁর যুদ্ধে যাওয়ার কঠিন সময় ও কয়েকটি অপারেশনের গল্প শোনান। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। এই বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি বেশি বলাবলি না থাকলে দেশের বিপদ বড় হবে। জাতি হিসেবে আমরা কলঙ্কিত হব। অপশক্তির উত্থান ঘটবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্বাভাবিক পথ হারাবে।’
নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তাৎপর্য ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী এই অলিম্পিয়াড আয়োজন করেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ শিরোনামে মার্চ মাসজুড়ে দেশব্যাপী এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সত্যজিৎ দাস বলেন, ‘আজ শিক্ষার্থীরা খাতা–কলম নিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি পরীক্ষা দিল। আমার কাছে মনে হয়, এটি কেবল নিছক পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতা নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার এক মহা কর্মযজ্ঞ।’
মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের মতো দেশব্যাপী কর্মসূচি এই মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল বলে উল্লেখ করে সত্যজিৎ দাস এমন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য প্রথম আলো ও বন্ধুসভাকে ধন্যবাদ জানান। তাঁর মতে, প্রথম আলো সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করতে সিদ্ধহস্ত।
ব্লু বার্ড স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওয়াহিদা আমিন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই পড়ার প্রতি গুরুত্ব দেন। স্কুল–কলেজে পাঠাগারগুলো সক্রিয় করা এবং পাঠাগারের সংগ্রহে মুক্তিযুদ্ধের বই রাখার অনুরোধ জানান।
ভৈরব বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি প্রিয়াংকা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের জন্য গৌরবের। বন্ধুসভা সেই গৌরবের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। বন্ধুসভার একটি সম্পাদকীয় পদ রয়েছে “মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষণাবিষয়ক”। ভৈরব বন্ধুসভার নিয়মিত পাঠচক্রে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই থাকে, কুইজ প্রতিযোগিতা হয়। বন্ধুসভার বন্ধুরা বছরব্যাপী নানা আয়োজনের মাধ্যমে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করছে।’
অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রথম আলো ভৈরবের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমন মোল্লা, ভৈরব বন্ধুসভার মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক ভুবন আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন সভাপতি জান্নাতুল মিশু।
অলিম্পিয়াডের কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে ভৈরব উদয়ন স্কুলের আরাফ চৌধুরী, দ্বিতীয় গাজীপুর শাহিন ক্যাডেট একাডেমির মেহেরিন আক্তার, তৃতীয় ভৈরব উদয়ন স্কুলের তাসীন মাহমুদ, চতুর্থ এমবিশন পাবলিক স্কুলের ইসরাত জাহান, একই নম্বর পেয়ে যুগ্মভাবে পঞ্চম হয় ব্লু বার্ড স্কুলের সামিয়া খানম, জাহিদ মাহমুদ ও রাফসান মিয়া। পুরস্কার হিসেবে বিজয়ীদের দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই।
পুরস্কার পেয়ে ব্লু বার্ড স্কুলের শিক্ষার্থী সামিয়া খানম বলে, ‘কুইজ প্রতিযোগিতার জন্য কয়েক দিন ধরে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক তথ্য জেনেছি। এবার বইগুলো থেকে আরও নতুন তথ্য আমাকে সমৃদ্ধ করবে।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ভৈরব বন্ধুসভার সহসভাপতি আফিসা আলী, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক স্নেহা আলম, বন্ধু অনুপম, উদয়, হাবিবুল্লাহ, ইফরান সামির, তুহিন, ইমরান, আরবী প্রমুখ।
মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক, ভৈরব বন্ধুসভা