সুমাইয়া আক্তার (১১)। ছোট্ট মেয়েটির স্বপ্ন ছিল ঈদের দিনে নতুন জামা পরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরবে। কিন্তু অভাবের সংসারে সেই স্বপ্ন প্রায়ই অপূর্ণ থেকে যায়। তার বাবা ফখরুল ইসলাম রিকশা চালান, আর মা সুমি বেগম কাজ করেন মানুষের বাসায়। কোনোরকমে চলে তাদের সংসার। তাই এবারের ঈদে সুমাইয়ার জন্য নতুন জামা কেনা সম্ভব হয়নি মা–বাবার।
তবে ১৪ মার্চ বিকেলে সেই আক্ষেপ ঘুচে যায়। প্রথম আলোর গাজীপুর বন্ধুসভার বন্ধুরা তার হাতে তুলে দেন রঙিন নতুন ঈদের জামা। শুধু জামা নয়, দেওয়া হয় সেমাই, চিনি ও ঈদের খাদ্যসামগ্রী।
নতুন জামা হাতে পেয়ে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সুমাইয়ার মুখ। খুশিতে সে বলে, ‘এইবার ঈদটা অনেক ভালো হইব। নতুন কাপড় পইরা বন্ধুগ লগে ঘুরতে যামু।’
শুধু সুমাইয়া নয়, গাজীপুর শহরের আশপাশের কয়েকটি এলাকার সুবিধাবঞ্চিত আরও অনেক শিশুর মুখে এদিন ফুটে ওঠে আনন্দের হাসি। প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের অর্থায়নে ‘সহমর্মিতার ঈদ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সুবিধাবঞ্চিত ৫৫ শিশুকে নতুন জামা উপহার দেওয়া হয়। পাশাপাশি ওই শিশুদের পরিবারের জন্য দেওয়া হয় সেমাই, চিনি ও অন্য ঈদসামগ্রী।
মোস্তালিম এসেছে ৭৫ বছর বয়সী দাদি জোছনা বেগমের সঙ্গে। নতুন পোশাক পেয়ে তার আনন্দ দেখে দাদি জোছনা বেগম বলেন, ‘মোস্তালিমের বাবা মস্তিষ্কবিকৃত। একদিন হঠাৎ সবাইকে ফেলে কোথায় যেন চলে গেছে। আজ পর্যন্ত সে ফিরেনি। মা মারা গেছে স্ট্রোক করে। এখন মোস্তালিমসহ তাঁদের তিন বাচ্চা আমিই পালতেছি। এই ঈদে পোশাক পেয়া খরচে কমে গেছে। ভালো পোশাক হয়েছে তার।’
উপহার পেয়ে মো. রাফি প্যাকেট খুলে দেখছিল। একপর্যায়ে উপহারের শার্ট মাঠে দাঁড়িয়ে পরে সে জানায়, এই উপহার পাওয়ায় তার ঈদ ভালো কাটবে। উপহার নিতে সে তার মায়ের সঙ্গে এসেছে।
উপহার বিতরণের আগে সেখানে এক সংক্ষিপ্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন বন্ধুসভার উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অসীম বিভাকর তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক মানুষ প্রত্যেকের কাছেই ঋণী। এই যে সহমর্মিতা এবং আনন্দ ভাগাভাগি—এটা মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই কর্তব্য। প্রথম আলো বন্ধুসভা এভাবেই প্রতিবছর সব সময় সব মানুষের জন্য কাজ করে।’
সাংবাদিক ও লেখক ফারদিন ফেরদৌস বলেন, ‘আনন্দ ভাগ করলে বাড়ে। মানুষ হিসেবে সেই আনন্দের জয়গান করি আমরা। প্রথম আলো বন্ধুসভার সহমর্মিতার ঈদ আয়োজন সুবিধাবঞ্চিত সবার মুখে আনন্দের প্রতিচ্ছায়া হয়ে ধরা দিচ্ছে। এটি সাধুবাদ প্রাপ্য।’
গাজীপুর বন্ধুসভার সদস্যরা জানান, ঈদের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার লক্ষ্য থেকেই এই উদ্যোগ। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতিবছরই এমন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
বন্ধুসভার সদস্য তানিয়া আক্তার বলেন, ‘ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে পারাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
সংক্ষিপ্ত সভায় সঞ্চালনা করেন গাজীপুর বন্ধুসভার সভাপতি বাবুল ইসলাম। আরও বক্তব্য দেন গাজীপুর প্রেসক্লাবের তত্ত্বাবধায়কমণ্ডলীর সদস্য মাজহারুল ইসলাম মাসুম, রেজাউল করিম, সাদেক মৃধা প্রমুখ।