নতুন প্রজন্মকে বিকৃত কোনো ইতিহাস শেখানো উচিত নয়; মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করে তরুণদের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্যসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করে আবদুল মোতালেব বলেন, ‘শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় জীবন বাজি রেখে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশ স্বাধীনের জন্য অস্ত্র চালিয়েছি। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাক-হানাদারদের দেশ থেকে হটিয়ে বিজয় অর্জন করেছি। ৬ ডিসেম্বর ফেনীতে বিজয় নিশানা ওড়ানোর মাধ্যমে মুক্তিকামী মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় উল্লাস করেছিলেন। ৫৫ বছর পূর্বে সশস্ত্র সংগ্রামের যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছিলাম। কিন্তু এখন নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও এর ইতিহাস খাটো করে দেখার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা এখনো বেঁচে আছি—এ অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে।’
৩০ মার্চ দুপুরে ফেনীতে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে ফেনী সরকারি কলেজে এই অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে ফেনী বন্ধুসভা।
ফেনী সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বন্ধুসভার উপদেষ্টা মোশারফ হোসেন মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর সাবেক ফেনী প্রতিনিধি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের এবং দৈনিক ফেনীর সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক আরিফুল আমিন রিজভী। প্রথম আলোর ফেনী প্রতিনিধি নাজমুল হক শামীমের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন ফেনী বন্ধুসভার সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাবার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও মা বাধা দিলেন। অনেক বুঝিয়ে ফেনীর ছাগলনাইয়ার বক্সমাহমুদ হয়ে ভারতে চলে গেলাম। পাক-ভারত উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ক্যান্টনমেন্ট দেরাদুনে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ শুরু করি। জীবনে প্রথমবার প্লেনে চড়ে আগরতলা থেকে দেরাদুন জলি গ্রেন্ট বিমানবন্দরে যাই। পাহাড়ের রাস্তা বেয়ে সাড়ে সাত হাজার ফুট ওপরে ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতের বিলোনিয়ায় ফিরে দেশে এসে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।’
‘তৎকালীন ফেনীর মহকুমা কমান্ডার ও বর্তমান ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন ওরফে ভিপি জয়নালের নেতৃত্বে কাদা পানিতে ডুবে, বেতগাছের আঘাত সহ্য করে, সীমিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে পাক হানাদারদের সঙ্গে লড়াই করি। প্রশিক্ষণে বলা হয়েছিল, “তোমরা গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, অস্ত্রের চেয়েও তোমাদের বুদ্ধি খাটিয়ে যুদ্ধে জয়ী হতে হবে।” সেই বুদ্ধি ব্যবহার করে আমরা যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছি।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘২৫ মার্চ পিলখানায় ইপিএস সদস্যদের ওপর হামলার পরই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা কখন হবে, তা আমাদের কাছে বড় বিষয় ছিল না। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল এই দেশকে হানাদার মুক্ত করা। পিলখানার হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা হয়, যা স্বাধীনতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। এই হামলার পর ছাত্র-জনতা গর্জে ওঠে।
‘ফেনীর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা খাজা আহাম্মদ, যিনি তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং পরে এমএলএ হন। তাঁর পরামর্শেই আমরা ফেনীতে লড়াই করি। মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান হলো ফেনী সরকারি কলেজ। যেখানে হানাদার বাহিনী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গোলবারে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এখানে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ও বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরত্বের সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও দৈনিক ফেনীর সম্পাদক আরিফুল আমিন রিজভী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে সংগ্রাম পরিষদের অবদান অনবদ্য। একাত্তরের মার্চেই তারা মুক্তিকামী বাঙালিদের প্রাথমিক অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। ভারতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোদ্ধাদের পাঠিয়েছিল এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সংগ্রাম পরিষদ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। আমরা তাদের স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানাই।’
‘নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং সেই ইতিহাসের সঠিক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে,’ যোগ করেন আরিফুল আমিন রিজভী।
ফেনী সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘বন্ধুসভা বছরের পর বছর যেসব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আয়োজন করে, তার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড অন্যতম। এ আয়োজনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য ও ইতিহাসের এক শক্তিশালী মেলবন্ধন তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি, প্রথমা প্রকাশনীর ছাপিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইগুলো তরুণদের জ্ঞান ও বোধকে সমৃদ্ধ করবে।’
মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডে ৩০টি প্রশ্নের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৮টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন ফেনী সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মেহানী তৃষা। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছেন যথাক্রমে ফেনী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের আনজানা আনজুম চৌধুরী, ফেনী আলিয়া কামিল মাদ্রাসার ওমর ফারুক, ফেনী সরকারি কলেজের রাকিব মাহমুদ ও সুদীপ্ত দাস। মেধাভিত্তিক আরও পাঁচ শিক্ষার্থীকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে ‘ফেনীর ৩১ বীর মুক্তিযোদ্ধা’ নিয়ে গবেষক আরিফুল আমিন রিজভীর গ্রন্থিত বই। কুইজে অংশ নেয় ১০৮ শিক্ষার্থী।
খাতা মূল্যায়নের দায়িত্বে ছিলেন ফেনী সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আহমদ আলী বিভোর, ফেনী বন্ধুসভার উপদেষ্টা শেখ নুর উদ্দিন চৌধুরী, কাজী ইকবাল আহমেদ, নুরুল আমিন, সহসভাপতি আমিনুল ইসলামসহ অন্যরা। পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পাদক স্বাক্ষর চক্রবর্তী ও সদস্য জুমায়েত ভূইয়া।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বই উপহার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। আয়োজনটির সহযোগিতায় ছিলেন ফেনী বন্ধুসভার বন্ধুরা।
সভাপতি, ফেনী বন্ধুসভা