শুধু খবর পড়া নয়, যোগাযোগের শিল্পও নিউজ প্রেজেন্টেশন

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

ক্যামেরার সামনে বসে আছেন একজন সংবাদ উপস্থাপক। সামনে ছোট একটি লেন্স। সেই লেন্সের ওপাশে লাখো দর্শক। তাঁদের কাছে একটি খবর পৌঁছে দিতে উপস্থাপকের হাতে থাকে মাত্র কয়েকটি অস্ত্র—কণ্ঠ, উচ্চারণ, চোখের ভাষা, মুখের অভিব্যক্তি ও আত্মবিশ্বাস। তাই সংবাদ উপস্থাপনা শুধু খবর পড়া নয়, এটি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের একটি শিল্প। ভালো নিউজ প্রেজেন্টার হতে হলে শুধু সুন্দর কণ্ঠ থাকলেই হয় না, জানতে হয় কী বলছেন এবং কীভাবে বলছেন।

প্রথম আলো বন্ধুসভা ও অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির (এবিসি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনলাইন কর্মশালা ‘প্রেজেন্টেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এর প্রথম সেশনে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন স্টার নিউজের জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক ফারাবী হাফিজ। ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই সেশনের বিষয় ছিল ‘সংবাদ উপস্থাপনা’।

বাংলাদেশে সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে বিটিভির সংবাদ পাঠকদের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তাঁদের হাত ধরেই দেশে সংবাদ উপস্থাপনার বিভিন্ন ধারা তৈরি হয়েছে। এখন এই পেশায় পার্টটাইম, ফুলটাইম ও চুক্তিভিত্তিক—বিভিন্নভাবে কাজের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনার পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে নিজেদের গড়ে তুলতে পারেন।

তবে উপস্থাপনা শেখার প্রয়োজন শুধু টেলিভিশনে খবর পড়ার জন্য নয়। চাকরির সাক্ষাৎকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থাপনা, বিসিএসের ভাইভা কিংবা দৈনন্দিন জীবনে নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরতেও উপস্থাপনার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।
ফারাবী হাফিজের মতে, একজন উপস্থাপকের দক্ষতার দুটি প্রধান দিক—ভার্বাল ও নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন। অর্থাৎ কথা বলার দক্ষতার পাশাপাশি শরীরের ভাষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভার্বাল কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হয় শুদ্ধ ও স্পষ্ট উচ্চারণে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে একজন উপস্থাপকের কথা পৌঁছাতে হয়। তাই প্রমিত বাংলা ও পরিষ্কার উচ্চারণের বিকল্প নেই। তবে অসাধারণ কণ্ঠ না থাকলেও সংবাদ উপস্থাপক হওয়া সম্ভব। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে কণ্ঠকে আরও সুন্দর ও স্পষ্ট করা যায়।
নিশ্বাসের ব্যায়াম, ঠোঁট ও জিবের আড়ষ্টতা দূর করার অনুশীলন এ ক্ষেত্রে সহায়ক। প্রতিদিন জোরে জোরে পত্রিকা পড়া বা কবিতা আবৃত্তিও কণ্ঠ ও উচ্চারণ উন্নত করতে পারে।

সংবাদ উপস্থাপনায় নন-ভার্বাল কমিউনিকেশনও গুরুত্বপূর্ণ। হাতের অবস্থান, চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, পোশাক, বসা বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি—সবকিছুই দর্শকের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়। জড়সড় না হয়ে স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি বজায় রাখা জরুরি। ক্যামেরার সামনে কথা বলার সময় লেন্সের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে কথা বলতে হয়, যেন দর্শকের সঙ্গেই সরাসরি যোগাযোগ হচ্ছে।

অডিশনের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো স্পষ্টভাবে কথা বলার দক্ষতা। চেহারা বা বাহ্যিক উপস্থিতি অনেকটাই সাজিয়ে তোলা যায়, কিন্তু ভালো উচ্চারণ ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হয় নিজের চেষ্টায়। প্রতিষ্ঠানের দেওয়া স্ক্রিপ্ট বারবার পড়ে অনুশীলন করতে হয়।

শেষ পর্যন্ত একজন ভালো নিউজ প্রেজেন্টার তৈরি হন কয়েকটি গুণের সমন্বয়ে—বিষয় সম্পর্কে জানা, স্পষ্ট উচ্চারণ, কণ্ঠের নিয়ন্ত্রণ, চোখের যোগাযোগ, সঠিক শরীরী ভাষা এবং আত্মবিশ্বাস। কারণ, সংবাদ উপস্থাপনায় শুধু তথ্য জানলেই হয় না; সেই তথ্য দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার শিল্পটিও জানতে হয়।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা