উপকূলে সবুজ ফেরাতে বন্ধুসভার সাত শতাধিক চারাগাছ রোপণ

কয়রা বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিছবি: বন্ধুসভা

খুলনা শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে সুন্দরবন–সংলগ্ন কয়রা উপজেলার মসজিদকুঁড় গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। নদের তীরেই পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাস ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদকুঁড় মসজিদ। চুন-সুরকির প্রায় ৭ ফুট পুরু দেয়াল, চারটি ইট-পাথরের স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ৯টি গম্বুজ আর লালচে পোড়া ইটের কারুকাজ—দেখলে মনে হয়, সময় যেন এখানে থমকে আছে।

৪ জুলাই বিকেলে সেই ইতিহাসের আঙিনায় যোগ হলো নতুন এক গল্প। মসজিদের সামনে তখন ব্যস্ত কয়েকজন তরুণ। কেউ শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়ে চারা লাগানোর গর্ত করছেন, কেউ চারার গোড়ায় মাটি চেপে দিচ্ছেন, আবার কেউ পানি ঢালছেন সদ্য রোপণ করা গোলাপ, বকুল, নিম ও কাঁঠালগাছের চারায়। পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন ‘প্রথম আলো বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’ লেখা ব্যানার হাতে ছবি তুলছিলেন।

গোলাপগাছের গোড়ায় পানি দিতে দিতে কয়রা বন্ধুসভার সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বললেন, ‘ইতিহাস থেকে জেনেছি, হজরত খানজাহান আলী (রহ.)–এর নির্দেশনায় তাঁর বিশ্বস্ত সহচর বোরহান খাঁ, যিনি বুড়া খাঁ নামেও পরিচিত, প্রায় ১৪৪৫ সালের দিকে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এমন একটি ঐতিহাসিক স্থানে গাছ লাগাতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছে। কয়েক বছর পর যখন আবার এখানে আসব, বড় হয়ে ওঠা গাছগুলো দেখলে মনে হবে, এর সঙ্গে আমাদেরও একটা সম্পর্ক আছে।’

কয়রা বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

এ সময় কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর কয়রা প্রতিনিধি ইমতিয়াজ উদ্দীন, কয়রা বন্ধুসভার সভাপতি রাসেল আহাম্মেদ, সহসভাপতি নিরাপদ মুন্ডা, সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম, সদস্য আনারুল ইসলাম, মামুন হোসেন, আশরাফুলসহ বন্ধুসভার অন্য সদস্যরা।

মসজিদকুঁড়ের এই আয়োজন ছিল কয়রা বন্ধুসভার সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির একটি অংশ। এক সপ্তাহ ধরে সংগঠনটির সদস্যরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাত শতাধিক ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করেছেন।

এর এক দিন আগে কপোতাক্ষ নদসংলগ্ন একটি গুচ্ছগ্রামে পৌঁছান বন্ধুসভার সদস্যরা। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলো এখন সেখানে নতুন করে জীবন গড়ার চেষ্টা করছে। সেই গ্রামের নারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নিমগাছের চারা। চারা হাতে নিয়ে বন্ধুসভার সদস্যদের অনুরোধে হাসিমুখে ছবি তুলছিলেন গুচ্ছগ্রামের নারীরা। তাঁদের একজন বললেন, ‘আমাগের এইহানে মানুষ ছাগল বেশি পালন করে। অন্য গাছ বড় করা কঠিন। নিমগাছের চারাই ভালো হইছে। ছাগলে খায় না। যত্ন কইরা বড় করতি পারব।’

কয়রা বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই চারার প্রজাতি নির্বাচন করেছেন বন্ধুসভার সদস্যরা। আম, আমড়া, নিম, কড়ই, অর্জুন, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের পাশাপাশি সংগ্রহ করা হয় গোলাপ, বকুল ও কৃষ্ণচূড়ার চারাও। চারাগুলো প্রথমে কয়রার খান সাহেব কোমর উদ্দিন কলেজসংলগ্ন এলাকায় সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেখান থেকে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, জনবসতি ও খালি জায়গায় পৌঁছে দেন বন্ধুরা।

কয়রা বন্ধুসভার সভাপতি রাসেল আহাম্মেদ বলেন, ‘এক সপ্তাহে আমরা সাত শতাধিক গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করেছি। উপজেলার ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের হাতে চারা তুলে দেওয়া হয়েছে। জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা উপকূলে সবুজ ফিরিয়ে আনার ছোট্ট একটি চেষ্টা এটি।’

এস ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মদিনাবাদ দারুস সালাম মহিলা দাখিল মাদ্রাসা, নাকশা তাহফিজুল কুরআন এতিমখানা ও কমপ্লেক্স, পি কে এস দারুছসুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসা, নূরে মাদিনা ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, কয়রা মদিনাবাদ দাখিল মাদ্রাসা, স্বর্ণকলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জয়পুর শিমলারাইট দারসুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ষোলহালিয়া মধ্যপাড়া জামে মসজিদ, মধ্যচক বায়তুন নূর জামে মসজিদসহ উপজেলার কয়েকটি মসজিদ প্রাঙ্গণেও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে।

কয়রা বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

কয়রা খান সাহেব কোমর উদ্দিন কলেজের শিক্ষক অনুপম কুমার বৈদ্য বলেন, ‘গাছ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। প্রথম আলো বন্ধুসভার তরুণদের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এমন কাজে সমাজের আরও মানুষ এগিয়ে এলে আগামী দিনের জন্য আরও নিরাপদ ও বাসযোগ্য একটি উপকূল গড়ে তোলা সম্ভব।’

কয়রার লালুয়া পানির ফিল্টার এলাকার খালি জায়গায়ও বৃক্ষরোপণ করেছে কয়রা বন্ধুসভা। এ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন সংগঠনের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক মহিদ হাসান। তাঁর উদ্যোগে প্রতিটি চারায় ‘প্রথম আলো কয়রা বন্ধুসভা’ লেখা লেমিনেটেড নামফলক লাগানো হয়েছে।

মোহিদ হাসান বলেন, ‘পানির ফিল্টার এলাকার পাশে মসজিদ ও মাদ্রাসা আছে, আমার বাড়িও কাছেই। তাই গাছগুলোর নিয়মিত পরিচর্যার দায়িত্ব আমি নিয়েছি। আমরা চাই, আজকের এই ছোট ছোট চারা একদিন বড় হয়ে এই জনপদকে আরও সবুজ করে তুলুক।’

স্বর্ণকলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নরুল আমিন বলেন, ‘বারবার ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে কয়রার সবুজ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। একটি গাছ মানেই আগামী দিনের একজন প্রকৃত বন্ধু। তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেগুলোর পরিচর্যাও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বিদ্যালয়ে লাগানো চারাগুলোর যত্ন আমরা নেব।’

কয়রা বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

এস ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতেও বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু হাসান বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম গাছ লাগানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। নিজের হাতে গাছ লাগানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তব শিক্ষা পাবে। একই সঙ্গে গাছের প্রতি দায়িত্ববোধও তৈরি হবে।’

কয়রা বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের সৌজন্যে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে ৭০০টি ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা আমাদের দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কয়রা বন্ধুসভা নিজেদের অর্থায়নে আরও ৫০টি গোলাপ, বকুল ও কৃষ্ণচূড়ার চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেছে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুধু গাছ লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ করছি না। প্রতিটি চারার পরিচর্যার দায়িত্ব নির্দিষ্ট সদস্যদের দেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, মানুষের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরি করা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রকৃতিকে রক্ষা করার সবচেয়ে সহজ পথ একটি গাছ লাগানো, আর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সেটিকে বাঁচিয়ে রাখা।’