চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির তৃতীয় তলার একটি কক্ষে বন্ধুসভার বন্ধুরা তখন দুটি দলে বিভক্ত। একটি দলকে পজিটিভ বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও অপর দলকে নেগেটিভ বডি ল্যাঙ্গুয়েজ উপস্থাপনের দায়িত্ব দেন প্রশিক্ষক। বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, বসার ধরন ও শরীরের ভঙ্গিমার মাধ্যমে সদস্যরা ইতিবাচক ও নেতিবাচক আচরণের পার্থক্য তুলে ধরেন।
এই দৃশ্য চট্টগ্রাম বন্ধুসভার উদ্যোগে ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ‘ক্রিয়েটিভ কানেকশন’ প্রশিক্ষণ কর্মশালার। নিজের ব্যক্তিত্বকে সমৃদ্ধ, অন্যের অনুভূতি উপলব্ধি করা এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও মানবিক করার লক্ষ্যে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে ছোট ছোট কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে পরিচিতি, যোগাযোগ ও স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানোর পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে আমরা কীভাবে অন্য মানুষের সঙ্গে আচরণ করি এবং আমাদের আচরণ অন্যের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে, সে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
কর্মশালায় নিজের উন্নতি, সহমর্মিতা ও সবার ভালো চাওয়া—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন নাট্যশিল্পী ও উন্নয়নকর্মী ওবায়দুল ইসলাম মুন্না। তিনি থিয়েটার ও অংশগ্রহণমূলক শিল্পের বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত বিকাশ, সহমর্মিতা, যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। ছিল দলীয় পারফরম্যান্স, অভিনয়, গান, আবৃত্তি, অভিব্যক্তি প্রকাশ, গল্প বলা এবং নানা ধরনের মজার ও শিক্ষণীয় কার্যক্রম।
যোগাযোগের ধরন নিয়ে একটি বিশেষ সেশন পরিচালনা করেন নওশীন আফরোজ। তাঁর আলোচনায় দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে নিজের কথা স্পষ্টভাবে বলা যায়, মনোযোগসহ শোনা এবং অন্যের অবস্থান বোঝার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
কর্মশালার এই পর্যায়ে একটি গান পরিবেশন করেন বন্ধু তিথি তালুকদার। ছোট্ট বন্ধু রাহা নাওয়ার কবিতা আবৃত্তি করে। এরপর দুটি পুতুলের মাধ্যমে মানুষের অভিব্যক্তি বোঝাতে বিশেষ পরিবেশনা করেন বন্ধু ইকবাল জিসান। এ সময় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যেমন হাসি-আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়, তেমনি মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও সহজভাবে বোঝানো হয়।
একটি পারফরম্যান্স ছিল ‘প্লেব্যাক থিয়েটার। শেড অ্যান্ড ব্রাইট’–এর সদস্যদের অংশগ্রহণে। তাঁরা নিজেদের জীবন থেকে বলা গল্প, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে অভিনয় ও সৃজনশীল প্রকাশের মাধ্যমে তুলে ধরেন।
কর্মশালাজুড়ে গুরুত্ব পায় সহমর্মিতার বিষয়টি। সমাজে যাদের কথা অনেক কম শোনা হয়—নারী, শিশু, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি কিংবা বিভিন্ন বৈচিত্র্যের মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির প্রতিও সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। প্রত্যেক মানুষের গল্প ও অভিজ্ঞতার মূল্য রয়েছে—এই উপলব্ধিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
অনুভূতি প্রকাশ করে অংশগ্রহণকারী আশরাফুর রহমান বলেন, নিজের উন্নতি শুধু নিজের জন্য নয়, বরং এর ইতিবাচক প্রভাব যেন চারপাশের মানুষের ওপরও পড়ে। একজন মানুষ যখন নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন হন, অন্যের কথা মন দিয়ে শোনেন, ইতিবাচকভাবে যোগাযোগ করেন এবং অন্যের অনুভূতিকে সম্মান করেন, তখন তার ব্যক্তিগত উন্নতি ধীরে ধীরে একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সভাপতি রুমিলা বড়ুয়া বলেন, ‘এ ধরনের সেশন অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমরা প্রতিদিন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, কিন্তু সত্যিকার অর্থে একে অপরকে কতটা বুঝতে পারছি—সেই জায়গাটি নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। নিজের অনুভূতি বোঝার পাশাপাশি অন্যের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার চর্চা ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ককে আরও সুন্দর করতে পারে।’
শেষে অতিথিকে সম্মাননা ও অংশগ্রহণকারীদের হাতে সনদ তুলে দেওয়া হয়। কর্মশালার সমন্বয় করেন প্রশিক্ষণ সম্পাদক বহ্নি শিখা। সহযোগী ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক সাকিব জিশান ও বন্ধু রূপা আক্তার।
সাংস্কৃতিক সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা