‘আইজ কম্বল পাইয়া মনে অইছে, রাইতে ঘুমডা আরামের হবেনে’

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নুরুদ্দিন সরদারেরকান্দি গ্রামে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন বন্ধুসভার বন্ধুরা
ছবি: প্রথম আলো

‘নদীভাঙনের শিকার হইছি কয়েকবার। শীত নামলে আমাগের জীবন থাইমা যায়। রাইতে ঘুম অয় না, গা ঠান্ডায় শক্ত হইয়া যায়, কালাইয়া আসে। ঘরে আলো নাই, পাটখড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়া বাতাস ঢুইকা পড়ে। পুরান কাপড় দিয়া কত আর ঢাকমু? আইজ এই কম্বল পাইয়া মনে অইছে, রাইতে ঘুমডা আরামের হবেনে।’

কম্বল হাতে পেয়ে পরম মমতাভরা মুখে কথাগুলো বলেন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নুরুদ্দিন সরদারেরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা রাহেলা বিবি (৮৭)।

শুধু রাহেলা বেগমই নন, ৭ জানুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ২৩৫ জন শিশু, নারী ও পুরুষ-বৃদ্ধের হাতে প্রথম আলো ট্রাস্টের অর্থায়নে কম্বল তুলে দেন বন্ধুসভার সদস্যরা। ফরিদপুর থেকে সড়ক এবং নৌপথ ছাড়া ওই এলাকায় যাওয়া সম্ভব নয়। সড়ক ও নৌপথ মিলিয়ে শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৫৭ কিলোমিটার।

কম্বল হাতে পেয়ে কুদ্দুস মোল্লারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মুনছুরা খাতুন (৮৩) বলেন, ‘আমি তো এহন ঠিকমতো দাঁড়াইতেও পারি না। শীত আইলে হাঁটু ব্যথা করে, বুক ধইরা আসে। আগুন জ্বালাইয়া গা সেঁকি, তা–ও ঠান্ডা যায় না। আজ কম্বলটা পাইয়া আল্লাহরে ডাক দিছি। আইজ কম্বলডা নিছি, দিলে ওম হবেনে। যারা আইসা দিছে, আল্লাহ যেন তাদেরে সুস্থ রাখে।’

শিকদারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা হালিমা বেগম (৫৪) বলেন, ‘এই চরে থাকলে মানুষরে মানুষ মনে করে না অনেকেই। আপনারা আগে আমাগো খোঁজ নিছেন, পরে ঠিকমতো কম্বল দিছেন। এইডা আমাগের কথা কোনো দিন ভুলব না।’

দর্জিকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আমেনা বিবি (৮৯) বলেন, ‘শীত আইলে বুকডা ফাটে। রাইতে ঠান্ডায় ঘুম অয় না। আইজ এই কম্বল পাইয়া চোখে পানি আইছে। মনে হইছে আমরা এখনো মইরা যাই নাই, তোমাগোর মতো কেউ আমাগোর কথা ভাবে। আইজ কম্বলটা পাইয়া মনে হইতেছে এই শীতটা ভালো কাটবেনে।’

ফরিদপুর থেকে লেগুনায় কম্বলগুলো নিয়ে সদরপুরের শয়তানখালী ঘাট এলাকায় যান বন্ধুসভার সদস্যরা। সেখান থেকে ট্রলারে করে পদ্মা নদী পার হয়ে কম্বল বিতরণের স্থানে যান তাঁরা
ছবি: প্রথম আলো

খলিফাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মতলেব শেখ (৮১) বলেন, ‘শীত আইলে বুড়া শরীর একদম নরম অইয়া যায়। কম্বলডা কামেই লাগবেনে।’

সরকারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা সোহেল ফরাজী (৪২) বলেন, ‘শীতে বাচ্চাগোর কষ্ট দেইখা বুক ফাইটে যায়। আজ কম্বল পাইয়া মনে হইতেছে এই শীতে অন্তত একটু শান্তি পাইমু। ফরিদপুর থেইকা আইসা আমাদের পাশে দাঁড়াইছেন—এইটা আমরা কোনো দিন ভুইলমু না।’

উল্লিখিত গ্রামগুলো ছাড়াও ওই ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি, দাফাকান্দি, মাদবরকান্দি, নন্দলালপুর, আদু মোল্লারডাঙ্গীসহ ১৪টি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে কম্বল বিতরণ করা হয়।

কাকডাকা ভোরে ফরিদপুর থেকে লেগুনায় কম্বলগুলো নিয়ে সদরপুরের শয়তানখালী ঘাট এলাকায় যান বন্ধুসভার সদস্যরা। সেখান থেকে ট্রলারে করে পদ্মা নদী পার হয়ে কম্বল বিতরণের স্থান সদরপুরের দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নন্দলালপুর খেয়াঘাটে এসে থামে ট্রলারটি।

এই ইউনিয়নটি মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন। নদীতে নৌকা বা ট্রলার ছাড়া এখান থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। এখানে ১৩ থেকে ১৪ হাজার বাসিন্দা বসবাস করে।

এ বিষয়ে দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এটি ফরিদপুরের মধ্যে দুর্গম একটি ইউনিয়ন। এই শীতে সরকারিভাবে যে কম্বল আসে, তা দিয়ে এখানকার চাহিদা মেটে না। প্রথম আলো এখানে কম্বল বিতরণের জন্য বেছে নেওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানাই। পাশাপাশি বলতে চাই, এই কম্বলগুলো সত্যিকারের অভাবী মানুষ পেয়েছে। এই দুর্গম এলাকায় কোনো ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে কম্বল বিতরণ হয় না। এ এলাকাটি মূল ভূখণ্ড থেকে এত দূরে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রলার পাড়ি দিয়ে এখানে কেউ আসে না।’

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর বন্ধুসভার সভাপতি জহির হোসেন, সহসভাপতি মানিক কুণ্ডু, সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পাল, অর্থ সম্পাদক শুভ বিশ্বাস, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক শ্যামল মণ্ডল, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক প্রান্ত ঘোষ এবং প্রথম আলোর ফরিদপুরের আলোকচিত্রী আলিমুজ্জামান। এ কাজে সহযোগিতা করেছেন সদরপুরের স্বেচ্ছাসেবী মিজানুর রহমান এবং দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের দফাদার আবুল হুসাইন।

এর আগে ৫ জানুয়ারি সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পাল ও স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক শ্যামল মণ্ডল বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দুস্থ ও দুর্গতদের শনাক্ত করে কম্বলের স্লিপ দিয়ে আসেন।

সভাপতি, ফরিদপুর বন্ধুসভা