কেন আজও পাঠককে নাড়া দেয় ‘শঙ্খনীল কারাগার’

চট্টগ্রাম বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসরছবি: বন্ধুসভা

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’ মধ্যবিত্ত জীবনের এক আখ্যান। বইটি নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা। ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্ধুসভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই পাঠচক্র হিরণ্ময় কথকতা সিরিজের ২৮তম পর্ব।

‘শঙ্খনীল কারাগার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। উপন্যাসটি কেন আজও পাঠকহৃদয়ে অম্লান, তা নিয়ে পাঠচক্রে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বন্ধুরা কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, ‘সাবলীল ভাষা এবং অতি সাধারণ জীবনের অসাধারণ রূপায়ণই এই উপন্যাসকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রেখেছে।’ মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়ন, ত্যাগ আর অদৃশ্য এক মায়ার বন্ধন কীভাবে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ হয়ে ওঠে, তা আলোচনায় উঠে আসে।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে খোকা ও তার পরিবার। খোকার বাবাকে ঘিরেই মূল সংকটের সূচনা হয়। সেই সঙ্গে তার বাবার অসুস্থতা পুরো পরিবারকে অর্থনৈতিক ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। তিনি পরিবারের ভিত্তি হলেও অসুস্থতার কারণে হয়ে ওঠেন এক নীরব কেন্দ্র, যার চারপাশে আবর্তিত হয় সব সম্পর্কের টানাপোড়েন। এই পারিবারিক বৃত্তে গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র রাবেয়া। তিনি গৃহপরিসরের আবেগ, দায়িত্ববোধ ও বাস্তবতার প্রতীক। তাঁর সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্পর্ক, বিশেষত খোকার সঙ্গে একধরনের নীরব বোঝাপড়া ও অন্তর্গত টানাপোড়েনকে সামনে আনে। অন্যদিকে কিটকি চরিত্রটি তুলনামূলকভাবে আলাদা এক আবহ তৈরি করে। তার উপস্থিতি পরিবারে স্বাভাবিকতা ও জীবনের হালকা দিককে তুলে ধরলেও সেটি সামগ্রিক সংকটের বিপরীতে এক ধরনের বৈপরীত্য হিসেবেই কাজ করে।

মন্টু চরিত্রটি এই ঘরোয়া পরিসরের বাইরে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। সে খোকার ঘনিষ্ঠ পরিমণ্ডলের মানুষ, যার মাধ্যমে বাইরের পৃথিবীর বাস্তবতা, স্বাভাবিকতা এবং কখনো কখনো কঠিন সত্য গল্পে প্রবেশ করে। মন্টুর সঙ্গে খোকার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও তা খোকার মানসিক অবস্থার প্রতিফলনও বটে।

সব মিলিয়ে এই চরিত্রগুলো আলাদা আলাদা নয়, বরং তারা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে তৈরি করেছে এক জটিল সম্পর্কজাল। খোকার বাবার অসুস্থতা সেই জালের কেন্দ্রবিন্দু, যা রাবেয়ার দায়িত্ববোধ, কিটকির ভিন্ন আবহ এবং মন্টুর বাহ্যিক বাস্তবতাকে একসূত্রে গেঁথে দেয়। এর মধ্য দিয়েই উপন্যাসটি দেখায়—মানুষ কেবল বাহ্যিক নয়, সম্পর্কের ভেতরেও বন্দী হয়ে পড়ে; আর সেই অদৃশ্য বন্দিত্বই হয়ে ওঠে জীবনের প্রকৃত ‘শঙ্খনীল কারাগার’।

প্রথমে বন্ধুরা একে একে বইটির প্রতিটি পাতা থেকে পাঠ করেন এবং পাঠ শেষে বইটি সম্পর্কে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। দপ্তর সম্পাদক জয় চক্রবর্তী বলেন, ‘এই বইটি যেন নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের এক প্রতিচ্ছবি। লেখকের উপন্যাসটি সত্যিই মুগ্ধ করেছে।’

পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক কামরান চৌধুরী বলেন, ‘বইটিতে লেখক বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। এ ধরনের বই পাঠের মাধ্যমে আমরা সমাজ ও মানুষের সম্পর্ক সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারব।’

পাঠচক্রের সমন্বয়কারী হিসেবে ছিলেন পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক কামরান চৌধুরী এবং তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাফসিরুল ইসলাম। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বন্ধু তুষার কবির, অর্ণব মহাজন, অদ্রীক রায় ও আতাউল মোস্তফা।

বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা