‘গাছটি অনেক যত্ন করে লাগাব এবং পরিচর্যা করব’

রাস্তার পাশে গাছের চারা রোপণ করছেন দিনাজপুর বন্ধুসভার বন্ধুরাছবি: বন্ধুসভা

পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কয়েক ধাপে বৃক্ষরোপণ করেছে দিনাজপুর বন্ধুসভা। কর্মসূচির আওতায় জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়ণ প্রকল্প, জনবহুল এলাকা এবং বন্ধুসভার সদস্যদের মধ্যে দুই হাজারের অধিক ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে।

‘বৃক্ষ শুধু রোপণ নয়, যত্ন নিয়ে বাঁচাতে হয়’ প্রতিপাদ্যে ১৬ জুলাই শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।

প্রথম ধাপ: খেয়াঘাট এলাকায় বৃক্ষরোপণ
প্রথম ধাপে বন্ধুসভার সদস্যরা বীরগঞ্জ উপজেলার জয়গঞ্জ খেয়াঘাট এলাকার ফাঁকা সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেন। একই সঙ্গে এলাকার একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রাঙ্গণেও বৃক্ষরোপণ করা হয়। কর্মসূচিতে স্থানীয় বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বন্ধুসভার সদস্যদের সহযোগিতা করেন। স্থানীয় মানুষের এমন অংশগ্রহণ কর্মসূচিকে আরও প্রাণবন্ত ও সফল করে তোলে।

বীরগঞ্জ উপজেলার জয়গঞ্জ খেয়াঘাট এলাকার ফাঁকা সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেন বন্ধুরা
ছবি: বন্ধুসভা

দ্বিতীয় ধাপ: শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা
একই দিন বেলা তিনটায় দ্বিতীয় ধাপে ঝাড়বাড়ী দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় ও ঝাড়বাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে দুটি করে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশসচেতনতা ও বৃক্ষপ্রেম গড়ে তোলাই ছিল এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

গাছ পেয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলে, ‘আমি এর আগেও দিনাজপুর বন্ধুসভার কাছ থেকে একটি সফেদাগাছ পেয়েছিলাম। গাছটি এখন অনেক বড় হয়েছে। আমার গাছ লাগাতে খুব ভালো লাগে। এবারও গাছটি অনেক যত্ন করে লাগাব এবং পরিচর্যা করব।’

সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সৌরভ রায় বলে, ‘আমি কৃষ্ণচূড়াগাছ পেয়েছি। এই গাছ আমার খুব প্রিয়। আমি নিয়মিত পানি দেব এবং অনেক যত্ন করে বড় করব।’

শিক্ষার্থীদের হাতে দুটি করে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়
ছবি: বন্ধুসভা

তৃতীয় ধাপ: আশ্রয়ণ প্রকল্পে বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ
চলমান কর্মসূচির তৃতীয় ধাপে দিনাজপুর সদর উপজেলার সরকারি দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্প—গুদিপাড়া ও সুরিবলতরে বৃক্ষরোপণ করা হয়। পাশাপাশি আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত প্রতিটি পরিবারের নারীদের হাতে দুটি করে ফলদ গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়।

গাছ পেয়ে গুদিপাড়ার বাসিন্দা ইয়াসমিন আরা (৩৫) বলেন, ‘বিনা মূল্যে গাছ পেয়ে খুব ভালো লাগছে। নিজের সন্তানের মতোই যত্ন করে বড় করব।’

একই এলাকার জাহানারা খাতুন (৪০) বলেন, ‘কিনে আনার সুযোগ হয় না। আপনারা গাছ দিয়েছেন, খুব ভালো হয়েছে। নিয়মিত পানি দেব, বাচ্চার মতো যত্ন করে বড় করব।’

সুরিবলতর এলাকার ববিতা আক্তার বলেন, ‘এগুলো খুব ভালো ফলের গাছ। বাড়ির পাশে লাগাব, যত্নও করব।’

আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত প্রতিটি পরিবারের নারীদের হাতে দুটি করে ফলদ গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়
ছবি: বন্ধুসভা

চতুর্থ ধাপ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবুজায়ন
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির পরবর্তী ধাপে দিনাজপুর সদর উপজেলার চাঁদগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোফাজ্জল হোসেনের হাতে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা তুলে দেন দিনাজপুর বন্ধুসভার সদস্যরা। কলেজ ক্যাম্পাসকে আরও সবুজ ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলাই ছিল এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

এ সময় অধ্যক্ষ মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘যেমন একটি শিশুকে সঠিকভাবে লালনপালন করলে সে ভবিষ্যতে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, তেমনি একটি গাছেরও সঠিক পরিচর্যা করলে তা পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’ এ সময় তিনি দিনাজপুর বন্ধুসভার প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

চাঁদগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোফাজ্জল হোসেনের হাতে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা তুলে দেন দিনাজপুর বন্ধুসভার সদস্যরা
ছবি: বন্ধুসভা

পঞ্চম ধাপ: বন্ধুসভার সদস্যদের হাতে গাছের চারা বিতরণ
পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কর্মসূচির পঞ্চম ধাপে দিনাজপুর বন্ধুসভার সদস্যদের হাতে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়। এ সময় উপস্থিত বন্ধুরা নিজ নিজ বাড়ি এবং এলাকার খালি জায়গায় চারা রোপণ ও নিয়মিত পরিচর্যার অঙ্গীকার করেন।

বন্ধুসভার সভাপতি শবনম মুস্তারিন বলেন, ‘শুধু গাছ লাগালেই হবে না, প্রতিটি গাছকে বাঁচিয়ে তোলার দায়িত্বও আমাদের সবার। একটি গাছ বড় হতে বছরের পর বছর সময় লাগে, কিন্তু অযত্নে তা খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি চারার পরিচর্যা নিশ্চিত করার ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’

শিক্ষার্থীদের হাতে দুটি করে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়
ছবি: বন্ধুসভা

সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্র রায় জানান, সবুজ ভবিষ্যতের প্রত্যয়ে দিনাজপুর বন্ধুসভার এই ধারাবাহিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুধু গাছ লাগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবেশসচেতনতা সৃষ্টি, তরুণদের সামাজিক দায়বদ্ধতায় উদ্বুদ্ধ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়ণ প্রকল্প, জনসাধারণ এবং বন্ধুসভার সদস্যদের সম্পৃক্ত করে পরিচালিত এ কর্মসূচি ইতিমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

দিনাজপুর বন্ধুসভার উপদেষ্টা রাজিউল ইসলাম কর্মসূচির সমাপনীতে বলেন, ‘প্রকৃতিকে আরও সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তুলতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করা হবে। সংগঠনের বিশ্বাস, আজকের একটি গাছই আগামী দিনের নির্মল বাতাস, নিরাপদ পরিবেশ এবং সবুজ বাংলাদেশের ভিত্তি।’

সাধারণ সম্পাদক, দিনাজপুর বন্ধুসভা