আদিম প্রবৃত্তি থেকে সমাজবাস্তবতা: পাঠচক্রে ‘প্রাগৈতিহাসিক’

জামালপুর বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসরছবি: বন্ধুসভা

বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রথাবিরোধী ও বাস্তবতাবাদী রূপকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী ছোটগল্প ‘প্রাগৈতিহাসিক’ নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে জামালপুর বন্ধুসভা। ১৬ অক্টোবর বিকেলে আশেক মাহমুদ কলেজ প্রাঙ্গণে এ আসর বসে।

গভীর মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা, উন্মুক্ত মতবিনিময় এবং কুইজ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এই পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতেই উপস্থিত বন্ধুরা গল্পটি নিয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশের পাশাপাশি এর চরিত্রচিত্রণ ও অন্তর্দৃষ্টিমূলক বার্তা নিয়ে আলোচনা করেন।

মূল আলোচনায় সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা ছোটগল্পের ধারায় এক বিপ্লবী নাম। ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব ও কার্ল মার্ক্সের সমাজভাবনার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ আমরা তাঁর সাহিত্যে দেখতে পাই। “প্রাগৈতিহাসিক” গল্পে তিনি মানুষের পশুপাখিতুল্য আদিম প্রবৃত্তি, ক্ষুধা, বাঁচার তাগিদ এবং সমাজের অনগ্রসর অংশের এক নির্মম ও কঠোর সত্যকে সাহসিকতার সঙ্গে উন্মোচন করেছেন। গল্পের মূল চরিত্র “ভিখু” কিংবা “মেহোর” জীবনের ট্র্যাজেডি কোনো একটি নির্দিষ্ট যুগের চিত্র নয়; বরং তা মানুষের আদিম প্রবৃত্তি ও অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের চিরন্তন প্রতীক। বন্ধুসভার সদস্যদের নিয়মিত এমন বিশ্লেষণাত্মক পাঠচর্চা তাঁদের চিন্তা, বিবেক ও সমাজভাবনাকে আরও পরিপক্ব ও মানবিক করবে।’

বন্ধু রকিয়া জান্নাত গল্পের শিল্পমান, চরিত্রগুলোর গভীরতা এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘গল্পের পরতে পরতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে ডার্ক বা কৃষ্ণমুখী বাস্তবতার ছাপ রেখেছেন, তা একজন পাঠককে প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দেয়। মানুষের ভেতরের সামাজিক ও সভ্য মুখোশের পেছনের যে মূল নগ্ন সত্তা—ক্ষুধা ও কাম; তা তিনি নির্মোহভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর অপরাধপ্রবণতা ও জীবনসংগ্রামের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুর সত্যকে বুঝতে হলে আমাদের সমকালীন সমাজব্যবস্থার কাঠামোকেও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ ধরনের বিশ্বমানের সাহিত্য পাঠ আমাদের মানবেতর জীবন এবং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা জটিল মনস্তত্ত্বগুলোকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে শেখায়।’

বন্ধু আরিফুল ইসলাম ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের ভাষারীতি, গঠনকৌশল, প্রতীকী অর্থ এবং সমকালীন সাহিত্যে এর অসামান্য গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান শক্তির জায়গাটি হলো তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণক্ষমতা ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি চরিত্রগুলোকে সহানুভূতি দিয়ে কৃত্রিমভাবে মহান কিংবা সুন্দর করার চেষ্টা করেননি; বরং তারা যেমন, ঠিক সেভাবেই তাদের প্রকাশ করেছেন। গল্পে ব্যবহৃত উপমা, ভাষার ধার এবং কাহিনির গতি অত্যন্ত ধারালো। আজকের এই আধুনিক ও যান্ত্রিক যুগে দাঁড়িয়েও “প্রাগৈতিহাসিক” গল্পের প্রাসঙ্গিকতা এতটুকু ম্লান হয়নি, যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টিশীলতারই অনন্য প্রমাণ।’

পাঠচক্র শেষে জামালপুর বন্ধুসভার বন্ধুরা
ছবি: বন্ধুসভা

আলোচনার ওপর ভিত্তি করে পাঠচক্র শেষে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। কুইজে যৌথভাবে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বিজয়ী হন বন্ধু আরিফুল ইসলাম ও কার্যনির্বাহী সদস্য মহসিন হাসান।

পাঠচক্রে আরও উপস্থিত ছিলেন সহসাংগঠনিক সম্পাদক বাকি বিল্লাহ, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক নুসরাত ইসলাম, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক জোবায়ের আহমদ, কার্যনির্বাহী সদস্য বায়েজিদ, বন্ধু কাকন, নাজমুল, সাব্বির, আরিফুল ইসলাম, মেহেদী, আরিফ হাসান, শাফায়েত জামিল, তুবা, অয়ন, হাফিজ, সীমান্ত, রিফাত, মেহেদী খান, অর্ক, অন্তর, হাসানসহ অনেকেই।

সহসাংগঠনিক সম্পাদক, জামালপুর বন্ধুসভা