দেশপ্রেমের সঙ্গে মানবপ্রেমেরও সুন্দর সমন্বয় ‘উইংস অব ফায়ার’

সাতক্ষীরা বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসর
ছবি: বন্ধুসভা

ভারতের এগারোতম রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ড. এ পি জে আবদুল কালামের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘উইংস অব ফায়ার’। সম্প্রতি বইটি নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে সাতক্ষীরা বন্ধুসভা।

পাঠচক্রের আলোচনায় উঠে আসে, তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে ভারতের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এবং পরবর্তী সময়ে দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার পেছনে এ পি জে আবদুল কালামের দীর্ঘ পথের গল্প।

১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর তামিলনাড়ুর এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এ পি জে আবদুল কালাম। শৈশবে চরম প্রতিকূলতা অতিক্রম করে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা নেন এবং ডিআরডিও ও ইসরোতে বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেন। ভারতের প্রথম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ যান (SLV-III) এবং ‘অগ্নি’ ও ‘পৃথিবী’র মতো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও পারমাণবিক পরীক্ষায় মূল নেতৃত্ব দেওয়ায় তাঁকে ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ বলা হয়।

বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি তিনি ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে ‘জনগণের রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে খ্যাতি পান। ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘ভারত রত্ন’ পাওয়া এই মহান ব্যক্তিত্ব তরুণদের স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করেছেন। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পাঠচক্রে উঠে আসে রামেশ্বরম থেকে রাষ্ট্রপতি ভবন—এক দীর্ঘ যাত্রার পাঠ। ‘উইংস অব ফায়ার’ শুধু একজন সফল মানুষের জীবনী নয়; এটি সীমিত সুযোগের মধ্য থেকেও কীভাবে একজন মানুষ নিজের সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন, তার একটি জীবন্ত দলিল।

‎শৈশবের সরল জীবন, পরিবারের মূল্যবোধ, শিক্ষকদের প্রভাব, জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি গভীর আগ্রহ—সবকিছু মিলিয়েই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে কালামের ব্যক্তিত্ব। পরবর্তী সময়ে ভারতের মহাকাশ গবেষণা কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে দেশের বিজ্ঞান অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যায়।

তবে বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর সাফল্যের তালিকায় নয়; বরং সাফল্যের পেছনের মানুষটির গল্পে। কোথাও ব্যর্থতা, কোথাও অনিশ্চয়তা, কোথাও কঠিন সিদ্ধান্ত—সবকিছুর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাওয়ার যে মানসিকতা, সেটিই বইটিকে পাঠকের কাছে আলাদা করে তোলে।

‎ব্যর্থতা শেষ নয়, নতুন শুরুর দরজা
‎পাঠচক্রের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় ব্যর্থতার প্রতি এ পি জে আবদুল কালামের দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর জীবন দেখায়, ব্যর্থতা কোনো পথের শেষ নয়; বরং পরবর্তী সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার একটি অংশ।

‘উইংস অব ফায়ার’-এর অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো ব্যর্থতা সম্পর্কে আবদুল কালামের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি জীবনের বিভিন্ন ব্যর্থতা খোলামেলা ভাষায় তুলে ধরেছেন।

একসময় এ পি জে আবদুল ভারতীয় বিমানবাহিনীর পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনী পরীক্ষায় তিনি সফল হতে পারেননি। এই ব্যর্থতা তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিলেও তিনি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। পরবর্তী সময়ে এসএলভি-৩ উৎক্ষেপণের প্রথম প্রচেষ্টাও পুরোপুরি সফল হয়নি। একজন প্রকল্পনেতা হিসেবে কালামের কাছে এটি ছিল কঠিন অভিজ্ঞতা। কিন্তু তাঁর ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব ব্যর্থতার দায় একা তাঁর ওপর চাপিয়ে দেয়নি। বরং তাঁকে আরও সাহস দিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করার সুযোগ দেন। পরে যখন প্রকল্পটি সফল হয়, তখন সেই সাফল্যের কৃতিত্ব পুরো দলকে দেওয়া হয়।

সাতক্ষীরা বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসর।

এই ঘটনাগুলো বইটির গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। ব্যর্থতা লজ্জার বিষয় নয়, বরং শেখার সুযোগ। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি মানুষ আবার চেষ্টা করে, তবে ব্যর্থতাই ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত হতে পারে। কালাম মনে করতেন, নেতার কাজ হলো ব্যর্থতার সময় দলের পাশে থাকা এবং সাফল্যের সময় কৃতিত্ব সহকর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া।

‎এ পি জে আবদুল কালামের জীবন আমাদের শেখায়, ধর্ম, জাতি বা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্যের চেয়ে মানুষ হিসেবে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রামেশ্বরমের বহুধর্মীয় ও সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ তাঁর এই চিন্তাকে গড়ে তুলেছিল। তাই বইটির পাঠচক্রে দেশপ্রেমের সঙ্গে মানবপ্রেমেরও সুন্দর সমন্বয় দেখা যায়।

‎সাতক্ষীরা বন্ধুসভার সভাপতি মৃত্যুঞ্জয় কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘উইংস অব ফায়ার’ পড়ার পর হয়তো প্রত্যেক পাঠকের অভিজ্ঞতা এক হবে না। কেউ দেখবেন সংগ্রামের গল্প, কেউ বিজ্ঞানীর উত্থান, কেউ নেতৃত্বের শিক্ষা, আবার কেউ খুঁজে পাবেন নিজের স্বপ্নকে নতুন করে দেখার সাহস।

সহসাংগঠনিক সম্পাদক নাইমুর রহমানের সঞ্চালনায় পাঠচক্রে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা কল্যাণ ব্যানার্জি, সহসভাপতি রাহাতুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বিল্যাহ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোকাররাম বিল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক করিমন নেছা, সাংস্কৃতিক সম্পাদক শিরিনা আক্তার, ম্যাগাজিন সম্পাদক শাওন হোসাইন, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক সুদীপ্ত দেবনাথ, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক শাশ্বত পার্থিব, বইমেলা সম্পাদক কাজী রুবায়েত, বন্ধু মেধাসহ অন্যরা।

সহসাংগঠনিক সম্পাদক, সাতক্ষীরা বন্ধুসভা