মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস হৃদয়ে ধারণ করে নতুন প্রজন্মকে দেশ গড়ার কারিগর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ৩১ মার্চ সকালে মাগুরা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’-এ তাঁরা আহ্বান জানান। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মাগুরা বন্ধুসভা।
বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হয় অলিম্পিয়াডের মূল পর্ব। এতে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাগুরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক আবদুল ওহাব। বিশেষ অতিথি ছিলেন সদস্যসচিব মো. ওয়ালিউজ্জামান, সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান মঞ্জু।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওহাব শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখিয়ে বলেন, ‘তোমাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হবে, যাতে তোমরা দেশের কর্ণধার হতে পারো। তোমাদের ভেতর থেকেই ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী হবে এবং তোমরা দেশ গড়ে তুলবে।’
১৯৪৭-এর দেশভাগ ও তৎকালীন বৈষম্যের কথা স্মরণ করে আবদুল ওহাব বলেন, ‘শাসনভার পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ছিল না। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই ছিল চরম বৈষম্য। মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হতে পারত না, বড়জোর কেরানি পর্যন্ত যেতে পারত। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশকে সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে তোমাদের।’
এই মুক্তিযোদ্ধা নিজের যুদ্ধে যাওয়ার পটভূমি বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘বাজার থেকে আমার এক নিরীহ বন্ধুকে ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হয়। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, নিরস্ত্র হয়ে মরার চেয়ে ট্রেনিং নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্য মেরে মরব।’
মাগুরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সদস্যসচিব মো. ওয়ালিউজ্জামান বলেন, ‘২৫ মার্চের কালরাতে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর কাপুরুষের মতো গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল। বাঙালির অস্ত্র বলতে তখন ছিল শুধু মনোবল আর বাঁশের লাঠি।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের ব্যর্থতা হলো, আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস পুরোপুরি পৌঁছে দিতে পারিনি। এ কারণে এখনো এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, মুক্তিযোদ্ধাদের অপদস্থ করার সাহস কেউ কেউ দেখায়। সঠিক ইতিহাস উপস্থাপনের মাধ্যমে এগুলো প্রতিহত করতে হবে। এই স্বাধীন দেশটিকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব এখন তোমাদের।’
আলোচনা সভা শেষে অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণকারী বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই উপহার দেওয়া হয়। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমেই নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও ত্যাগের মহিমা সম্পর্কে জানতে পারবে।