ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের মাতৃভাষার জন্য অর্জন ও আত্মত্যাগের মাস; যা বাংলা ভাষার অস্তিত্বের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ এবং স্বজন হারানোর বেদনা সবকিছুই মিশে আছে এই স্মৃতিতে। কিন্তু যাঁরা ওই সময়টি পার করেছেন, তাঁদের তখনকার অনুভূতি আমরা কতটুকু জানতে বা হৃদয়ে ধারণ করতে পেরেছি!
১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নোয়াখালী বন্ধুসভা ২০২৩ সালের পঞ্চম পাঠচক্রের আয়োজন করে। পাঠচক্রে কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত গল্প ‘মৌন নয়’ নিয়ে আলোচনা করা হয়। যেখানে ঢাকায় ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের নিয়ে দেশের অন্যান্য স্থানে মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং মনের অবস্থা কী ছিল; তা প্রকাশ পেয়েছে।
গল্পের মূল চরিত্রে যাত্রীবাহী বাসে এক প্রবীণ, যিনি ভাষা আন্দোলনে শহীদ হওয়া তাঁর ছেলের শোকে হতবিহ্বল। তাঁর শোকের ছায়া যেন পুরো বাসটিকে গ্রাস করেছে। বাসে যে ১০-১২ জন যাত্রী ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকেই টুঁ শব্দটি করা সমীচীন মনে করছেন না। সবাই মৌন।
গল্পের শুরুতেই যেমন লেখা ছিল, ‘কিছুক্ষণ আগে যেন অনেক কথা হয়ে গেছে। অনেক অনেক কথা। তারই তর্জনী উঁচানো উদ্ধত শাসনে সব চুপ। পার্শ্বস্থ দ্রুতচারী গাছপালা থেকে আগত নীড়–সন্ধানী পাখিদের মিষ্টি চিৎকার, শুধু ব্যতিক্রম। অনেক, অনেক কথা ছড়ানো রয়েছে জীর্ণ বাসের কাঠের ফ্রেমে। এখন তাই সবাই স্তব্ধ। বিরহী কান্নায় বুক হালকা করে দিয়ে চেয়ে আছে বিষণ্ন দিগন্তের দিকে। আর কথা বলা নিষ্প্রয়োজন।’
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই এত বেশি শোকগ্রস্ত ছিল যে কারও কোনো কিছুতেই তাড়া নেই, বাস সহকারীর যাত্রী নেওয়ার চেষ্টা নেই, বাসচালকের ঠকে যাওয়ার ভয় নেই; এমনকি নেশাখোরেরও আজ বিড়ি খাওয়ার সাহসটুকু নেই। লেখক বলেন, ‘সমস্ত বাংলাদেশের গাছপালা, নদী–নালা, খাল–বিল, ছায়াপথ, বনজঙ্গল পার হয়ে দূরত্বের ব্যবধান উপেক্ষা করে, বর্বরতার সম্মুখে স্তব্ধ মিছিলের লক্ষ্য চোখের দৃষ্টির সঙ্গে মিশে গেছে—আজ একক চোখে তাই মনে হয় দৃষ্টি নেই।’
নোয়াখালী বন্ধুসভার প্রশিক্ষণ সম্পাদক ওয়ালিদ সালেহীন বলেন, ‘গল্পে বাসটি আসলে সমগ্র বাংলাদেশকে বোঝায় এবং যাত্রীদের তখনকার অনুভূতি ওই সময়ে মানুষের মনের অবস্থা প্রকাশ করে। হাজারো মা–বাবার বুক খালি হওয়ার চাপা আর্তনাদ যেন মুখ ফেটে বেরিয়ে আসতে চায়।’
ঠিক যেমন ‘মৌন নয়’ গল্পের শেষ লাইনের মতো, ‘জোড়া জোড়া জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টি স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে পড়ে। দমকে দমকে সিংহ গর্জন এখনই ফেটে পড়বে। সকলের গলার রগ কেঁপে কেঁপে উঠছে দমকে–দমকে।’ একে একে বন্ধুরা যখন গল্পটি পড়ে যাচ্ছিলেন সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই সময়টিতে ফিরে গিয়েছিলেন।
পাঠচক্র শেষে নোয়াখালী বন্ধুসভার নিয়মিত বৈঠকের অংশ হিসেবে ফেব্রুয়ারি মাসের গুরুত্বপূর্ণ দিবস, মজার মজার সব দিবস এবং এ মাসে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক আসিফ আহমেদ। ১৭ ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলা ভাষার শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন। পাঠচক্রের শুরুতে রূপসী বাংলার কবি হিসেবে সমাধিক পরিচিত এই কবির স্মরণে তাঁর লেখা ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক তাজকির হোসেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, সহসভাপতি জাহিদ হাসান, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক আফরিনা ইসলাম, অর্থ সম্পাদক উম্মে ফারহীন, কার্যনির্বাহী সদস্য ধ্রুব ভূঁইয়া, বন্ধু তাহসিন রাহমান, নাদিমুর মারুফ, ইরফান উদ্দিন, নূরে জান্নাতসহ অন্য বন্ধুরা।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, নোয়াখালী বন্ধুসভা