গোবিপ্রবি বন্ধুসভার পাঠচক্রে শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’

গোবিপ্রবি বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসরছবি: বন্ধুসভা

শহীদুল্লা কায়সারের অনবদ্য সৃষ্টি ‘সংশপ্তক’ উপন্যাস নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে গোবিপ্রবি বন্ধুসভা। ৪ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এটি অনুষ্ঠিত হয়।

উপন্যাসের পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কাল পর্যন্ত বিস্তৃত। মূল বিষয়বস্তু তৎকালীন পূর্ব বাংলার গ্রামীণ সমাজের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি। এখানে জমিদারদের শোষণ, কৃষক সমাজের দারিদ্র্য, নারীর অসহায়তা, সামাজিক কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আন্দোলনের প্রভাব রয়েছে। দুটি প্রধান গ্রাম বাকুলিয়া ও তালতলি এবং এই গ্রামের মানুষের জীবনসংগ্রামের চিত্র উপন্যাসটিতে মুখ্য।

কাহিনিতে একদিকে যেমন সমাজের নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম ও স্বপ্নও তুলে ধরা হয়েছে। হুরমতির লাঞ্ছনা, রমজানের নিষ্ঠুরতা, সেকান্দর মাস্টারের আদর্শবাদিতা এবং জাহেদের বিপ্লবী চেতনা—এই সবকিছু মিলেমিশে এক জটিল সামাজিক আখ্যান তৈরি করেছে।

উপন্যাসটিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম অংশে মূল দ্বন্দ্বের সূত্রপাত এবং চরিত্রদের প্রাথমিক পরিচয় ও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। গ্রামীণ সমাজের চিত্র, জমিদারদের প্রভাব, হুরমতির প্রতি অবিচার এবং জাহেদের আগমন এই অংশের প্রধান দিক। দ্বিতীয় অংশে ঘটনাপ্রবাহ আরও বিস্তৃত হয় এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে চরিত্রদের ভূমিকা ও পরিণতি উন্মোচিত হয়। কলকাতা ও ঢাকার নাগরিক জীবনের কিছু চিত্র দেখা যায়।

উপন্যাসটিতে গ্রামীণ সমাজের বাস্তবচিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনো প্রকার আদর্শবাদিতা বা রোমান্টিকতার আশ্রয় না নিয়ে লেখক সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন। প্রতিটি চরিত্র যেন সমাজে ঘটে যাওয়া ঘটনার দর্পণ।
যেমন জাহেদ: উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত, প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী যুবক। সে সমাজের কুসংস্কার ও অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করতে চায়।
হুরমতি: গ্রামীণ সমাজের এক অসহায় নারী, যে সমাজের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়। অবৈধ সন্তান ধারণের জন্য তাকে নির্মম শাস্তি পেতে হয়।
রমজান: গ্রামের প্রভাবশালী ও নিষ্ঠুর ব্যক্তি, যে নিজের স্বার্থের জন্য সবকিছু করতে পারে। সেকান্দর মাস্টার: আদর্শবাদী ও কর্তব্যপরায়ণ শিক্ষক।
রাবু: জাহেদের সহযোগী ও প্রেমিকা। সে সমাজের বাঁধাধরা নিয়ম ভেঙে জাহেদের সঙ্গে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। রাবু নারীমুক্তি ও প্রগতিশীল চিন্তার প্রতীক।
ফেলু মিয়া: গ্রামের মাতব্বর ও জমিদার শ্রেণির প্রতিনিধি। সে পুরোনো ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী।

কতগুলো বাক্য সমাজে প্রতিনিয়ত উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন—
‘মানুষের মুক্তিই আমার একমাত্র কামনা।’
‘আমরা কি শুধু মার খেয়েই যাব? প্রতিরোধ করার কি আমাদের কোনো শক্তি নেই?’
‘অন্ধকারের শক্তিকে পরাজিত করতে হলে আলোর মশাল জ্বালাতে হবে।’
‘পেটের দায়ে কত কিছুই তো করতে হয় মা।’
‘এ দুনিয়ায় দুর্বলদের কোনো স্থান নেই।’
‘ক্ষমতা থাকলে সবই সম্ভব।’
প্রতিটি কথাই পরিবেশ ও সমাজের সঙ্গে মিলে।

পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক, গোবিপ্রবি বন্ধুসভা