বাবার একটি চায়ের দোকান। সংসারের খরচ চালিয়ে ছেলের পড়াশোনার জন্য আলাদা করে কোচিং বা টিউশনির ব্যবস্থা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই নিয়মিত ক্লাস ও পাঠ্যবইয়ের ওপর ভরসা করেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছে রিফাত। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে সে। রিফাত বলে, ‘কোচিং বা টিউশন পড়তে পারিনি। স্কুলের ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে, আর পাঠ্যবই পড়ে প্রস্তুতি নিয়েছি। ভবিষ্যতে একজন প্রকৌশলী হয়ে বাবার কষ্ট কমাতে চাই।’
রিফাতের মতো নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সাফল্য পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর নোয়াখালী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয় শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা। নোয়াখালী বন্ধুসভার সহযোগিতায় এতে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ–৫ পাওয়া ৮০০–এর বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
বৃষ্টিভেজা সকালে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে শিল্পকলা একাডেমি চত্বর। শিক্ষার্থীরা প্রথম আলো এক্সপেরিয়েন্স জোনের বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেয়। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল আয়োজন শুরু হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গোলাম রব্বানী নিজের শিক্ষাজীবনের স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আমি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছিলাম। স্কুলেরই এক বড় ভাইকে দেখে স্বপ্ন দেখলাম, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। সেই স্বপ্ন লালন করে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি এবং আজ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে তোমাদের সামনে কথা বলতে পারছি।’
শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ব্যবহারে সতর্ক করে অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বলেন, ‘পড়ালেখার প্রয়োজন ছাড়া স্মার্টফোন ব্যবহার করা যাবে না। এ বিষয়ে অভিভাবকদেরও সচেতন থাকতে হবে।’
প্রথম আলোর হেড অব ফার্স্ট নিউজ টিপু সুলতান বলেন, ‘জিপিএ–৫ জীবনের সবকিছু নয়। সামনে তোমাদের আরও বড় চ্যালেঞ্জ আসবে। কোনো পরীক্ষার ফল প্রত্যাশামতো না হলে ভেঙে পড়বে না। ভুল থেকে শিখে আবার চেষ্টা করার শক্তিটা ধরে রেখো।’
শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে টিপু সুলতান বলেন, ‘যে পেশাতেই যাও, এমন মানুষ হও, যাকে অন্যরা বিশ্বাস করতে পারে; বিপদে যার কাছে সাহায্য চাইতে পারো।’
স্বাগত বক্তব্যে প্রথম আলোর নোয়াখালীর নিজস্ব প্রতিবেদক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘জিপিএ–৫ পাওয়া আনন্দের ও গর্বের বিষয়। তবে এই সাফল্যের পেছনে শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষকদের অবদানও রয়েছে। তোমাদের আজকের এই অর্জনকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।’
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন অনুষদের ডিন মো. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ এবং রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদ রফিক উল্লা আক্তার মিলন।
অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠু ও প্রাণবন্তভাবে সম্পন্ন করতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন নোয়াখালী বন্ধুসভার বন্ধুরা। অতিথি ও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, বিভিন্ন ইভেন্ট পরিচালনা, অনুষ্ঠানস্থলের ব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্বসহ বিভিন্ন কাজে সক্রিয় ছিলেন তাঁরা।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নোয়াখালী বন্ধুসভার সভাপতি আসিফ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক সানি তানজিদ ও বন্ধু আফরিনা ইসলাম। আলোচনার ফাঁকে কবিতা আবৃত্তি করেন বন্ধু মিহানুর রহমান এবং গান পরিবেশন করেন বন্ধু স্বস্তিকা দাশ। দ্বিতীয় পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী অনীক সূত্রধর। এ ছাড়া অনলাইন কুইজে অংশ নেওয়া ১০ শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করেন অতিথিরা।
সাফল্যের আনন্দ, স্বপ্ন আর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্পের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা। পুরো আয়োজনের পূর্বপ্রস্তুতি থেকে অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত নোয়াখালী বন্ধুসভার ৩৫ বন্ধু নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। এ ছাড়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার ৯ বন্ধু অনুষ্ঠানটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করেন।
অর্থ সম্পাদক, নোয়াখালী বন্ধুসভা