ঈদের আনন্দ পৌঁছে গেল কয়রার অসচ্ছল মানুষের ঘরে

উপহার পাওয়া কোরবানির মাংস হাতে মানুষের উচ্ছ্বাসছবি: প্রথম আলো

ঈদের দিনের বিকেলে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা পূর্বপাড়া মাঠে ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছিলেন মানুষ। কারও হাতে ব্যাগ, কেউ আবার ছোট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। চারদিকে ঈদের শুভেচ্ছা আর কুশলবিনিময়ের পাশাপাশি চলছিল অন্য রকম এক ব্যস্ততা। মাঠের এক পাশে কোরবানি করা গরু ও ছাগলের মাংস ভাগ করে দিচ্ছিলেন কয়রা বন্ধুসভার সদস্যরা।

দূর থেকে এটি শুধু মাংস বিতরণের আয়োজন মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি ছিল ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার এক মানবিক উদ্যোগ।
এই আয়োজনের সূচনা হয় ঈদের আগের দিন বুধবার থেকে। ওই দিন সকাল থেকে বন্ধুসভার সদস্যরা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ২৬টি অসচ্ছল পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রীর বস্তা পৌঁছে দেন। প্রতিটি বস্তায় ছিল চাল, ডাল, সেমাই, চিনি, আলু, পেঁয়াজ, দুধ, বাদামসহ ১৭ ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

কয়রা বন্ধুসভার সদস্যরা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঈদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন অসচ্ছল পরিবারের সদস্যদের হাতে
ছবি: প্রথম আলো

বন্ধুসভার সদস্যরা জানান, ঢাকার বাসিন্দা ও প্রথম আলোর নিয়মিত পাঠক ফারুক আহমেদ ঈদ উপলক্ষে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর উদ্যোগ নেন। তিনি তাঁর স্বজন সৌদি আরবপ্রবাসী মুনিম হাসিব দীন ও আকিফ সাঈতের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গরু কেনা ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণের জন্য অর্থ পাঠান কয়রা বন্ধুসভার কাছে। সেই অর্থে স্থানীয় হাট থেকে একটি গরু ও একটি ছাগল কেনা হয়। ঈদের দিন কোরবানি শেষে মাংস তুলে দেওয়া হয় মানুষগুলোর হাতে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নাকসা পূর্বপাড়া মাঠে দেখা যায়, চারপাশে উৎসবের আমেজ। কেউ মাংস কাটছেন, কেউ ওজন করছেন, আবার কেউ তালিকা মিলিয়ে প্যাকেট হাতে তুলে দিচ্ছেন মানুষের কাছে। স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচালিত পুরো আয়োজনেই ছিল একধরনের উৎসবের আবহ।

মাংস নিতে আসা ষাটোর্ধ্ব বিধবা আমেনা বেগম বলেন, ‘আমার ঘরে তো কোরবানি হয় না। রোজার ঈদের সময় একবার গরুর মাংস খাইছিলাম। এরপর আর কেনার সামর্থ্য হয়নি। সকালে যখন শুনলাম বন্ধুসভার ছেলেরা মাংস দেবে, তখন থেকেই খুব ভালো লাগছিল।’

কয়রা বন্ধুসভার সদস্যরা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঈদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন অসচ্ছল পরিবারের সদস্যদের হাতে
ছবি: প্রথম আলো

দিনমজুর আবদুর রহিম বলেন, ‘এখন কাজকর্ম খুব কম। সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। ঈদের দিনে এমন সহযোগিতা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। বাচ্চারা গোশত খেতে চায়। আজ এই মাংস নিয়ে গেলে তারা ঈদের আনন্দ পাবে।’

কয়রার শরবানু খাতুনের জীবনে এবারের ঈদও এসেছে ভিন্নভাবে। স্বামী গফুর গাজীর মৃত্যুর পর তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করে ও কখনো ভিক্ষা করে সংসার চালান। শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে তাঁর ছোট্ট সংসার। বন্ধুসভার সদস্যদের কাছ থেকে খাদ্যসামগ্রী পেয়ে আবেগভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার প্রতিবন্ধী মেয়েডারে সেমাই রান্না কইরে খাওয়াতি পারবানে।’

একই এলাকার জুহুরা খাতুন জানান, তাঁর পরিবারে দুজন সদস্য বাক্‌প্রতিবন্ধী। একজন পুরোপুরি বোবা, অন্যজন এক চোখে দেখেন না। তিনি বলেন, ‘ঈদের জন্য আলাদা কিছু কেনার সামর্থ্য ছিল না। খাবারগুলো পেয়ে মনে খুব শান্তি লাগছে।’

কোরবানির মাংস উপহার
ছবি: প্রথম আলো

কয়রা বন্ধুসভার সভাপতি রাসেল আহমেদ বলেন, ‘ঢাকার ফারুক আহমেদ ভাই ও তাঁর দুই প্রবাসী আত্মীয়দের ইচ্ছা ছিল ঈদের আনন্দ যেন কিছু অসহায় মানুষের ঘরেও পৌঁছে যায়। আমরা শুধু সেই দায়িত্ব পালন করেছি। আজ ৬০ জন দরিদ্র মানুষের হাতে কোরবানির মাংস তুলে দেওয়া হয়েছে।’

রাসেল আহমেদ জানান, এর আগে প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন দেখে ফারুক আহমেদ সহায়তা পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপরই এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরামর্শ করা হয়।

মুঠোফোনে ফারুক আহমেদ বলেন, ‘ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণ হয়, যখন তা সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করা যায়। কয়রার অসহায় মানুষের জন্য সামান্য কিছু করতে পেরে ভালো লাগছে।’

কোরবানি, খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণ—সবই বন্ধুসভার সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমে সম্পন্ন করেছেন
ছবি: প্রথম আলো

কয়রা বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদের উপহার আর কোরবানির মাংস হাতে পেয়ে অসহায় পরিবারগুলোর চোখেমুখে যে স্বস্তির হাসি দেখেছি, সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

বন্ধুসভার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমি নিজে কয়রার মানসিক প্রতিবন্ধী শাহিদা খাতুনের হাতে খাদ্যসামগ্রীর বস্তা তুলে দিয়েছি। মানুষটা আনন্দে অনেকক্ষণ আমার দিকে নীরবে চেয়ে ছিলেন। সেই মুহূর্তটা এখনো মনের মধ্যে গেঁথে আছে।’

কয়রা বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও মদিনাবাদ কলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিন বলেন, ‘কোরবানি, খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণ—সবই বন্ধুসভার সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমে সম্পন্ন করেছেন। এ উদ্যোগ অসহায় মানুষের মুখে যে স্বস্তির হাসি ফুটিয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় অর্জন।