সবুজ ছায়ায় চড়ুইভাতি

চট্টগ্রাম বন্ধুসভার বার্ষিক বনভোজন ‘সবুজ ছায়ায় চড়ুইভাতি’
ছবি: বন্ধুসভা

১৬ জানুয়ারি ২০২৬। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল সাতটা। প্রথম আলো চট্টগ্রাম বন্ধুসভার অফিসের সামনে দুটি বড় বাস ঘিরে শুক্রবারের সকালের আরামের ঘুমকে উপেক্ষা করে একঝাঁক প্রাণবন্ত তরুণ-তরুণী। শীতের সকালের কুয়াশামাখা আলসেমি ঝেড়ে ফেলে সবার গন্তব্য পাহাড় আর সবুজের মায়া। উপলক্ষ চট্টগ্রাম বন্ধুসভার বার্ষিক বনভোজন ‘সবুজ ছায়ায় চড়ুইভাতি’।

সকাল সাড়ে সাতটায় চট্টগ্রামের কোলাহল ছেড়ে বন্ধুদের এই দল যাত্রা শুরু করে ফটিকছড়ির হাজারিখীল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ও রাঙাপানি চা–বাগানের উদ্দেশে। বাসের ভেতর শুরু হয় গানের আসর। তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মেঠো পথ ধরে দালানকোঠার শহর পেছনে ফেলে একসময় চারপাশ ভরে ওঠে গাঢ় সবুজে।

হাজারিখীল অভয়ারণ্যে অভ্যর্থনা জানায় শীতল ঝিরিপথ
ছবি: বন্ধুসভা

ঝিরিপথে অরণ্য দর্শন
সকাল ১০টায় বাস থামে হাজারিখীল অভয়ারণ্যের ফটকে। প্রায় ৩ হাজার একরের এই গহিন পাহাড়ি জঙ্গলে পা রাখতেই বন্ধুদের অভ্যর্থনা জানায় শীতল ঝিরিপথ। স্বচ্ছ জলের ধারা আর পাথুরে পথে শুরু হয় রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার।

সহসভাপতি ইব্রাহীম তানভীর বন্ধুদের সচেতন করে বলেন, ‘এই বন কয়েক শত প্রজাতির প্রাণী ও পাখির আবাস। প্রকৃতির এই জীববৈচিত্র্য আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। তাই আমরা কেউ কোনো ময়লা ফেলব না এবং নীরবতা বজায় রাখব।’

বনের গহিনে ঝিরিপথ ধরে যেতে যেতে দেখা মেলে নানা নাম না জানা পাখি ও গাছের। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দেন স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে। বনের ভেতর স্থানীয়দের ফল সংগ্রহের দৃশ্য বা হঠাৎ ডালপালায় বানরের লাফালাফি বন্ধুদের মুগ্ধ করে। সাধারণ সম্পাদক ইরফাতুর রহমান বলেন, ‘প্রকৃতিকে বদলাতে নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতেই আমাদের এই আয়োজন।’

রাঙাপানি চা–বাগানে বন্ধুরা
ছবি: বন্ধুসভা

চা–বাগানে মধ্যাহ্নভোজ ও জীবনবোধ
বেলা দুইটায় বনভোজনের দ্বিতীয় গন্তব্য ছিল রাঙাপানি চা–বাগান। প্রায় ২ হাজার ৭০০ একরের এই বিশাল বাগানের ছায়াতলে আয়োজন করা হয় দেশীয় খাবারের ভূরিভোজ। মেনুতে ছিল গরম ভাত, আলুভর্তা, বেগুনভর্তা, ডিম, মুরগির মাংস আর মাছ। খাওয়ার পর বন্ধুরা নিজ উদ্যোগে সব ময়লা পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলেন।

খাবার শেষে শুরু হয় চা–বাগানের রূপসুধা উপভোগ। সারি সারি চাগাছ আর ছোট ছোট টিলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা বাতাস জুড়িয়ে দেয় মন। সভাপতি রুমিলা বড়ুয়া এ সময় চা–শ্রমিকদের জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এক কাপ চায়ের পেছনে মিশে থাকে এই শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রম। তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা অসীম।’

সহসভাপতি নুরুজ্জামান খান যোগ করেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে এই মানুষগুলোর অবদান আমাদের মনে রাখা উচিত।’

স্বচ্ছ জলের ধারা আর পাথুরে পথে রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার
ছবি: বন্ধুসভা

আনন্দ আড্ডা ও খেলার আসর
চা–বাগানের সমতলে বসে শুরু হয় খেলাধুলা। বালিশ খেলা আর মার্বেল দৌড়ে মেতে ওঠেন বন্ধুরা। খেলার মধ্যে জেতার চেয়ে আনন্দ আর হাসাহাসিই ছিল মুখ্য। স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক আমেনা রুমির সঞ্চালনায় খেলার এই আসর যেন শৈশবকে ফিরিয়ে আনে বন্ধুদের মাঝে।

মনে একরাশ প্রশান্তি আর সুন্দর কিছু স্মৃতির ঝুলি জমা হয়
ছবি: বন্ধুসভা

নীড়ে ফেরা
সূর্য যখন পাটে বসার আয়োজন করছে, তখন চা–বাগানের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় বিশেষ চা–পানের আসর। তাজা বাগান থেকে সদ্য প্রক্রিয়াজাত কড়া চায়ের স্বাদ বন্ধুদের ক্লান্তি দূর করে দেয়। সন্ধ্যা নামতেই দুটি বাস রওনা হয় যান্ত্রিক শহরের দিকে।

সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানার নেতৃত্বে বাসে চলে গান আর ঝালমুড়ির উৎসব। রাত ৯টায় যখন বাস দুটি যাত্রা শেষে অফিসের সামনে থামে, তখন সবার চোখে রাজ্যের ক্লান্তি থাকলেও মনে ছিল একরাশ প্রশান্তি আর সুন্দর কিছু স্মৃতির ঝুলি।

আয়োজন বাস্তবায়নে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন সাধারণ সম্পাদক ইরফাতুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক জয় চক্রবর্তী ও কার্যনির্বাহী সদস্য তাজরিয়া তামিম।

দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা