জামালপুর বন্ধুসভার পাঠচক্রে ‘ক্রীতদাসের হাসি’

পাঠচক্র শেষে জামালপুর বন্ধুসভার বন্ধুরাছবি: বন্ধুসভা

কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের রূপকধর্মী উপন্যাস ‘ক্রীতদাসের হাসি’। এতে শাসকের স্বৈরাচারী মনোভাব, মানুষের পরাধীনতা, শোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার বিষয় অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লেখক সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে রূপক, প্রতীক, ব্যঙ্গ ও ইঙ্গিতের মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছেন।

‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসটি নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে জামালপুর বন্ধুসভা। ২ অক্টোবর আশেক মাহমুদ কলেজ প্রাঙ্গণে এই আসর বসে।

উপন্যাসের কাহিনির পটভূমিতে রয়েছে একজন ক্ষমতাবান শাসক এবং তার অধীন মানুষের জীবন। শাসক তার ক্ষমতার জোরে অধীন মানুষদের জীবন ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ফলে সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে নিজের মতপ্রকাশ করতে পারে না। তাদের জীবনে ভয়, অসহায়ত্ব ও পরাধীনতা নেমে আসে।

এই পরিস্থিতিতে মেহেরজানের হাসি কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। তার হাসি শুধু সাধারণ আনন্দের প্রকাশ নয়; এটি মানুষের স্বাধীন সত্তা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। একজন মানুষ পরাধীন অবস্থায় থাকলেও তার মনের গভীরে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে। মেহেরজানের হাসির মধ্য দিয়ে সেই আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশিত হয়েছে।

শাসক মানুষের বাহ্যিক জীবন ও কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের অনুভূতি ও স্বতঃস্ফূর্ততাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এভাবেই লেখক দেখিয়েছেন যে মানুষের স্বাধীন চেতনাকে জোর করে দাসে পরিণত করা যায় না।

‘ক্রীতদাসের হাসি’ নামটি অত্যন্ত অর্থবহ ও প্রতীকী। ‘ক্রীতদাস’ বলতে পরাধীন বা অন্যের অধীন মানুষকে বোঝায়। অন্যদিকে ‘হাসি’ মানুষের আনন্দ, স্বতঃস্ফূর্ততা ও স্বাধীন অনুভূতির প্রকাশ।

জামালপুর বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসর।

তাই ‘ক্রীতদাসের হাসি’ একটি গভীর বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। একজন ক্রীতদাসেরও যে নিজস্ব অনুভূতি, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, এই হাসি তারই প্রতীক। ফলে শিরোনামটি উপন্যাসের মূল বক্তব্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

উপন্যাসের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো স্বাধীনতা। স্বাধীনতা বলতে শুধু শাসকের হাত থেকে মুক্তি বোঝায় না; এর সঙ্গে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিজের অনুভূতি প্রকাশের অধিকার ও আত্মমর্যাদা জড়িত। লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষকে বাহ্যিকভাবে স্বাধীন দেখালেই সে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হয় না। যদি মানুষ ভয়ে কথা বলতে না পারে, নিজের মতপ্রকাশ করতে না পারে এবং নিজের অনুভূতি অনুযায়ী চলতে না পারে, তবে তার প্রকৃত স্বাধীনতা থাকে না।

উপন্যাসে ক্ষমতাবান শাসকের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার ও শোষণের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। শাসক যখন নিজের ক্ষমতাকে জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের কাজে ব্যবহার করে, তখন সেই ক্ষমতা শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। শওকত ওসমান এ ধরনের শাসনব্যবস্থার অমানবিক দিকটি তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের ওপর যত বেশি জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, তার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাও তত বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে।

মেহেরজান উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তার হাসির মধ্য দিয়ে লেখক একজন মানুষের স্বাভাবিক ও স্বাধীন সত্তাকে প্রকাশ করেছেন। তার চরিত্রকে বৃহত্তর অর্থে পরাধীন মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। তার হাসি শাসকের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেও প্রকাশ করে। কারণ, শাসক যত ক্ষমতাবানই হোক, মানুষের মনের স্বাভাবিক অনুভূতিকে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না।

‘ক্রীতদাসের হাসি’ শুধু একটি গল্পভিত্তিক উপন্যাস নয়; এটি পরাধীনতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের স্বাধীন সত্তার একটি শক্তিশালী প্রতীকী প্রকাশ। শওকত ওসমান ‘হাসি’র মতো একটি সাধারণ বিষয়কে গভীর প্রতীকে পরিণত করে মানুষের স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেছেন। তাই ‘ক্রীতদাসের হাসি’ বাংলা সাহিত্যে শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে মানবিক চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ রূপকধর্মী রচনা।

পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, জামালপুর বন্ধুসভা