জামালপুর বন্ধুসভার পাঠচক্রে বিভূতিভূষণের ‘পাগলী’

পাঠচক্র শেষে জামালপুর বন্ধুসভার বন্ধুরাছবি: বন্ধুসভা

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। তিনি ১২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার মুরারিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১ নভেম্বর ১৯৫০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘পাগলী’ গল্প নিয়ে পাঠের আসর করেছে জামালপুর বন্ধুসভা। ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে এটি অনুষ্ঠিত হয়।

গল্পটা আসলে তারানাথ তান্ত্রিকের নিজের মুখে বলা একটি পুরোনো অভিজ্ঞতা। তখন তারানাথ অনেক কম বয়সী এবং তন্ত্রসাধনা শেখার জন্য খুব আগ্রহী। সাধু-সন্ন্যাসীদের খুঁজতে খুঁজতে সে বীরভূমের একটি গ্রামের শ্মশানে থাকা এক রহস্যময় নারীর কথা জানতে পারে। সবাই তাকে মাতু পাগলী বলে ডাকত এবং বলত, সে সাধারণ পাগল নয়—ভয়ংকর শক্তিশালী তান্ত্রিক সাধিকা।

তারানাথ প্রথমবার পাগলীর কাছে গেলে পাগলী তাকে দেখেই তাড়িয়ে দেয়। বলে, এখান থেকে চলে যেতে। কারণ, তার দ্বারা তন্ত্রসাধনা হবে না এবং বিপদ হতে পারে। কিন্তু তারানাথ হাল ছাড়ে না। বারবার তার কাছে যায় এবং শিষ্য হতে চায়।

একদিন পাগলী তাকে কাছে বসতে দেয়। তারানাথ পরীক্ষা করার জন্য কিছু খাবার চাইলে পাগলী শ্মশানের পোড়া কয়লা হাতে দিয়ে বলে, এগুলোই খাবার। তারানাথ কয়লা মুখে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দেয়। পাগলী তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে এবং বলে, সে শুধু খাবারের লোভে তন্ত্রসাধনা করতে এসেছে নাকি!

এরপর পাগলী তাকে তন্ত্রের নানা রহস্যের কথা বলতে থাকে। সে ডাকিনী, শাঁখিনী, হাকিনী ইত্যাদি অদৃশ্য শক্তির কথা বলে এবং সতর্ক করে যে এসব শক্তি নিয়ে খেলতে গেলে বিপদ হতে পারে। গ্রামের লোকেরাও তারানাথকে সাবধান করে—পাগলীর কাছাকাছি না যেতে। কিন্তু তারানাথের কৌতূহল এত বেশি যে সে যেতে থাকে।

একদিন সন্ধ্যায় তারানাথ পাগলীর বটগাছের কাছে গিয়ে দেখে, সেখানে পাগলীর বদলে একজন সুন্দরী ষোড়শী মেয়ে বসে আছে। তার কথা, হাসি ও আচরণ দেখে তারানাথ বুঝতে পারে—এই মেয়ের মধ্যে যেন সেই পাগলীরই উপস্থিতি আছে।
পরে পাগলী তাকে বলে, তার তন্ত্রসাধনা করা উচিত নয়। কিন্তু তাকে পরীক্ষা করার জন্য সে শবসাধনা করার ব্যবস্থা করে। নদীর ধারে একটি অল্পবয়সী মেয়ের মরদেহ পাওয়া যায়। আশ্চর্যের বিষয়, মরদেহটির মুখ সেই ষোড়শী মেয়েটির মুখের মতোই।

তারানাথ শবের ওপর বসে মন্ত্র জপ শুরু করে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ভয়ংকর সব দৃশ্য দেখতে থাকে—চারদিকে অদ্ভুত নারী, পাখি, অসংখ্য নরকঙ্কাল এবং নানা ভয়াবহ বিভীষিকা। শেষে তার সামনে এক সুন্দরী মেয়ে এসে নিজেকে ষোড়শী মহাবিদ্যা বলে পরিচয় দেয়। পরে আরও ভয়ংকর এক নারীমূর্তি দেখা যায়, যাকে পাগলী মহাডামরী মহাভৈরবী বলে ব্যাখ্যা করে।

তারানাথ শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়ে শবসাধনার আসন ছেড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু আসল রহস্য এখানেই! সকালে হয়েছে ভেবে তারানাথ যখন ফিরে আসে, তখন পাগলী তাকে দেখে হাসতে থাকে। সে বলে, সে আসলে সারা রাত শ্মশানে ছিল না!
তারানাথের কাছে মনে হয়েছিল যেন পুরো রাত কেটে গেছে, কিন্তু বাস্তবে তখনো সবে সন্ধ্যা; অর্থাৎ পাগলী তাকে একধরনের তান্ত্রিক ভ্রম বা মায়ার মধ্যে ফেলেছিল। নরকঙ্কাল, ষোড়শী, মহাডামরী—সবকিছুই তার সাধনার পরীক্ষা হিসেবে তার সামনে প্রকাশিত হয়েছিল।

পাগলী তখন তাকে পরিষ্কার করে জানিয়ে দেয়, তারানাথের জন্য তন্ত্রসাধনার পথ নয়। সে এই পথে এগোলে বিপদে পড়বে। পাগলী তার মধ্যে কিছু শক্তি দিয়েছিল, কিন্তু সেই শক্তি বেশি দিন থাকবে না। কারণ, তারানাথের মধ্যে অর্থের প্রতি লোভ আছে।

শেষে তারানাথ সেখান থেকে চলে আসে এবং আর কোনো দিন পাগলীর দেখা পায়নি। বহু বছর পর সে যখন এই ঘটনা বর্ণনা করে, তখনো তার বিশ্বাস, মাতু পাগলী সাধারণ কোনো মানুষ ছিল না।

পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, জামালপুর বন্ধুসভা