মতিউর রহমান যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই উর্বর ভূমির মতো সফলতার ফসল ফলেছে। যেমন প্রথম আলো পত্রিকার ছাপা কাগজ, অনলাইন, রস আলো, গোল্লাছুট, স্বপ্ন নিয়ে, পড়াশোনা পাতা, নকশা, এবিসি রেডিও, চরকি, মেরিল–প্রথম আলো, প্রথম আলোর চর, বৃত্তি দেওয়া, গণিত অলিম্পিয়াড, শিক্ষক সম্মাননা এবং আমাদের বন্ধুসভা—সব কটি জায়গায় সফল।
ভৈরব বন্ধুসভার পাঠচক্রে লেখক পরিচিতি আলোচনায় কথাগুলো বলেন বন্ধু নাহিদ হোসাইন। ভৈরব বন্ধুসভার মুদ্রিত বই পড়ার ধারাবাহিক আয়োজন পাঠচক্রের অনন্য মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলার ২০০তম আসর বসে ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে শহরের এমবিশন পাবলিক স্কুল মাঠে। এটি চলতি বছর স্কুল পর্যায়ে শুরু হওয়া তৃতীয় পাঠচক্র। বিশেষ এই পাঠচক্রে পঠিত হয় প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সম্পাদিত গ্রন্থ বাংলাদেশের নায়কেরা। সঞ্চালনা করেন পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক মহিমা মেধা।
‘ভৈরব বন্ধুসভার এই ২০০তম পাঠচক্র শুধু একটি সংখ্যার উদ্যাপন নয়; এটি মুদ্রিত বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার এক দশকের সাধনা।’প্রথম আলো ভৈরবের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমন মোল্লা
শুরুতে মতিউর রহমানের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে সৃজনশীল, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতায় সম্মানসূচক ডক্টরেট পাওয়ার ওপর একটি প্রতিবেদন পর্দায় দেখানো হয়।
নাহিদ হোসাইন বলেন, ১৯৭০ সালে সাপ্তাহিক একতার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মতিউর রহমান। ১৯৯২ সালে ভোরের কাগজ–এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারপর ১৯৯৮ সালে গড়ে তোলেন প্রথম আলো। আজ প্রথম আলো বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রচারিত এবং পাঠকপ্রিয় বাংলা দৈনিক। তাঁর রচনা ও সম্পাদনায় ৩০টির বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে এবং সব কটি বই পাঠক সমাদৃত।
বাংলাদেশের ১৯ জন কীর্তিমান মানুষকে নিয়ে রচিত বাংলাদেশের নায়কেরা বই। তাঁদের কেউ সাহিত্যিক বা শিল্পী, কেউ উদ্যোক্তা বা বিজ্ঞানী, কেউ খেলোয়াড় বা পরিবেশকর্মী। তাঁরা জাতি হিসেবে আমাদের দিয়েছেন সম্মান, গৌরব আর আত্মমর্যাদা। তাঁরা নিজেরাই তাঁদের জীবনের গল্প বলেছেন এ বইয়ে।
কার্যনির্বাহী সদস্য প্রিয়াংকা তাঁর আলোচনায় বলেন, ‘পাঠচক্র আমাকে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের নায়কেরা বইটিতে আমরা দেখি পলান সরকার ও তাঁর বইয়ের প্রতি ভালোবাসা। এমন মানুষগুলো আছেন বলেই বাংলাদেশ কখনো হারবে না।’
সভাপতি জান্নাতুল মিশু আলোচনা করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়ে। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে মাত্র ১০ জন মিলে বই পড়ার যে যাত্রা শুরু করেছিলেন আবু সায়ীদ স্যার, সেখান থেকে আজ দেশজুড়ে ছড়িয়েছে বই পড়ার আন্দোলন। পাঠচক্রের সদস্যসংখ্যা ৫০ লাখের কাছাকাছি। আশির দশকের মাঝামাঝিতে সাত–আটটি বই নিয়ে শুরু হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রকাশনা। এখন বইয়ের সংখ্যা আট শতাধিক। একটি ভালো উদ্যোগ ভবিষ্যতে শত শত শুভসূচনার জন্ম দেয়। বাংলাদেশে এমনই উদাহরণ তৈরি করা এক প্রতিষ্ঠানের নাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। সারা দেশে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে বই পৌঁছে দিয়েছে তারা।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাফিস রহমান আলোচনা করেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে। তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের শুরুর ইতিহাস থেকে জানা যায়, তখন তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রফেসর ছিলেন। সে সময় ইউনিভার্সিটির পাশের দারিদ্র্যপীড়িত জোবরা গ্রামে গবেষণা প্রকল্প হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্পটি হাতে নেন। ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে সারাক্ষণ পড়ে থাকতেন ওই গ্রামে। ‘সাহায্য নয় সহযোগিতা করা’ এই কর্মযজ্ঞের মন্ত্রে অনুপ্রাণিত করেছিলেন গ্রামবাসীদের। স্বল্প পুঁজিতে হরেক রকমের ব্যবসায় নামালেন গ্রামের ভূমিহীনদের। জোবরা গ্রামের অনাবাদি জমিগুলো তেভাগা কর্মসূচির মাধ্যমে চাষাবাদের আওতায় আনা হলো। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনল এবং সফলতা পেল। প্রত্যেকের পারিবারিক অবস্থারও পরিবর্তন হলো।
শিক্ষক–শিক্ষার্থীসহ পাঠচক্রে অংশ নেন অন্তত ৭০ জন। আলোচনায় উঠে আসে গ্রন্থের নায়কদের জীবনকথা শুধু জানার জন্য নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিক, সাহসী ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতেও কতটা জরুরি। আরও উঠে আসে কীভাবে কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, চিন্তা ও সংগ্রামের মাধ্যমে আমাদের জাতিসত্তাকে সম্মানিত করেছেন। কেউ ইতিহাসের কঠিন পথ পেরোতে আমাদের সহায়তা করেছেন, কেউ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের সুনাম, আবার কেউ গড়ে তুলেছেন আমাদের মনন ও মূল্যবোধ। তাঁরা কেউই সহজ পথে হাঁটেননি। বাধা, সংকট আর প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা ছিলেন একাগ্র, দৃঢ় ও প্রত্যয়ী। সংগ্রামী জীবনের গল্পগুলো পাঠকের মনে সৃষ্টি করে গভীর অনুপ্রেরণা।
এক দশকে হওয়া ২০০টি পাঠের আসরের প্রতিটিতে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দেন প্রথম আলো ভৈরবের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমন মোল্লা। পাঠচক্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে বিশেষ সহযোগিতা দিয়ে আসায় শুরুতেই তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
আলোচনায় সুমন মোল্লা বলেন, ‘ভৈরব বন্ধুসভার এই ২০০তম পাঠচক্র শুধু একটি সংখ্যার উদ্যাপন নয়; এটি মুদ্রিত বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার এক দশকের সাধনা। আজ চারপাশে ভৈরব বন্ধুসভার বিপুল মর্যাদা অর্জনে মুখ্য ভূমিকা পাঠচক্রের।’
এমবিশন পাবলিক স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলে, ‘গ্রন্থের নায়কদের অনেকের নাম আগ থেকে জানতাম; কিন্তু তাঁদের জীবনকর্ম সম্পর্কে স্পষ্ট ছিলাম না। আজ সেই শূন্যতা পূরণ হলো।’
সভাপতি জান্নাতুল মিশু ও সাধারণ সম্পাদক আনাস খান জানান, ঈদুল ফিতরের পর ২০০তম পাঠচক্র উদ্যাপন করতে চান। বড় পরিসরে, বিশেষ করে আশপাশের বন্ধুসভার অংশগ্রহণে পাঠক উৎসব করার ইচ্ছা আছে।
বইয়ের আলোচনা নিয়ে স্কুলে আসায় এমবিশন পাবলিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিশ্বনাথ গুপ্ত ও পরিচালনা পর্ষদ সভাপতি আবৃত্তি শিল্পী নূর-ই-লাইলা বন্ধুসভাকে ধন্যবাদ জানান।
শেষে আলোচনা হওয়া বিষয়ের ওপর লিখিত কুইজ প্রতিযোগিতা হয়। মোট ১৩ জন কুইজ বিজয়ীকে দেওয়া হয় কিশোর ম্যাগাজিন কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা। বিজয়ীরা হলো মাহাদি, তানশি, তোয়া, আদনান, ইমরান হাসান, অর্জন দেবনাথ, তুবা, মীর রেদুয়ান, গল্প সাহা, জেনি সিকদার, আনিশা আক্তার ও সামিহা সারা।
পাঠের আসরে আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা ওয়াহিদা আমিন, জনি আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক রাহিম আহমেদসহ অন্য বন্ধুরা।
সাধারণ সম্পাদক, ভৈরব বন্ধুসভা