জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের হাতে যখন একে একে তুলে দেওয়া হচ্ছিল সম্মাননা ক্রেস্ট, তখন ভোলা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ছিল আনন্দের আবহ। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছে, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখছে, আবার কেউ ক্রেস্ট হাতে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা ভাবছে।
তবে দিনের আয়োজন শুধু একটি ক্রেস্ট পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে আরও বড় দায়িত্বের কথা, ভালো ফলাফলের পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার দায়িত্ব।
৩ অক্টোবর ভোলায় অনুষ্ঠিত হলো শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ২০২৬। সহযোগী হিসেবে ছিল ভোলা বন্ধুসভা। এতে জেলার সাত উপজেলা থেকে শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। তাদের সঙ্গে ছিলেন অভিভাবকেরাও। সকাল আটটা থেকেই শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বাড়তে থাকে ভিড়।
দূরপথ পেরিয়ে সংবর্ধনায় আছিয়া
চরফ্যাশন ওসমানগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া আছিয়া জাহান সংবর্ধনায় যোগ দিতে খুব ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়। অটোরিকশায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চরফ্যাশন শহরে পৌঁছে ধরে ভোরের প্রথম বাস। এরপর ভোলা শহরে এসে আবার অটোরিকশায় করে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছায়। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাবা। দীর্ঘ যাত্রার কষ্ট থাকলেও অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আনন্দে সেই কষ্ট ভুলে গেছে আছিয়া।
অন্যদিকে গাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া ইমরান মাহমুদ মনে করে, দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া শুধু সম্মাননা ক্রেস্ট নয়। তার ভাষায়, এই আয়োজন নতুন করে পথচলার সাহস ও আরও বড় হওয়ার প্রত্যয় দিয়েছে। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার অঙ্গীকারের কথাও বলে সে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে
শিক্ষার্থীদের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে ভোলা সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা না করে সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা ভালো ফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; একজন মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সে অন্য মানুষের প্রতি কতটা মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করে, তার মধ্যেও।’
বর্তমান সময়ে সমাজে নানা ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে জামাল উদ্দিন শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ‘কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক সময় মানুষ বিপদে পড়া ব্যক্তিকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে ঘটনাটি ভিডিও ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্মকে এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।’
ভোলা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এ টি এম আজহারুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেন, জিপিএ-৫ কোনো গন্তব্য নয়; এটি নতুন পথচলার শুরু। সামনে আরও বড় পরীক্ষা ও দায়িত্ব অপেক্ষা করছে। তাই ভালো ফলাফলের পাশাপাশি সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সহকারী অধ্যাপক মো. এরশাদ শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পেছনে মা-বাবা, শিক্ষক ও সমাজের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার পরামর্শ দেন। সামনে এইচএসসি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের আরও বড় চ্যালেঞ্জের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের আনন্দে অভিভাবকেরাও
সাগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুরাইয়া বেগম সন্তানকে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসে বলেন, ‘এমন আয়োজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক দুজনের জন্যই অনুপ্রেরণার।’ তাঁর মতে, প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে।
চরফ্যাশন থেকে ছেলে মাহাদী হাসানকে নিয়ে আসা অভিভাবক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এক জায়গায় দেখতে পেরে ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করি।’
গান, কবিতা আর উৎসবে শেষ হয় আয়োজন
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর ভোলা প্রতিনিধি মো. নেয়ামতউল্যাহ।
পরে শিক্ষার্থী বৈশাখী, তিথিরানী, মুবাশশিরা রহমান, ফারিয়া আক্তার ও লামিয়া আক্তার কবিতা আবৃত্তি ও গান পরিবেশন করে। সংগীত পরিবেশনের সময় বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের সংগীতশিল্পী মনির চৌধুরী শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ব্যবহারে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন।