কারও ছেলে শহরে বড় অফিসার, কারও ঘর ছিল আম-কাঁঠালের ছায়ায় ঘেরা বিশাল উঠান। অথচ আজ সবার ঠিকানা এক। ঢাকার ধামরাইয়ের ‘শৈলান প্রবীণ নিবাস’-এর এই নিঃসঙ্গ মানুষগুলোর কাছে ঈদ মানে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটানো নয়, বরং প্রিয়জনদের একটু সান্নিধ্য পাওয়া। সেই শূন্যতা ঘোচাতে এবং নিভৃতচারী এই মানুষগুলোর মধ্যে আনন্দ ছড়াতে ১৩ মার্চ সহমর্মিতার ডালি নিয়ে হাজির হন ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার বন্ধুরা। পুরো একটি দিন তাঁদের সঙ্গে কাটিয়ে, গল্প আর আড্ডায় প্রবীণদের একাকিত্ব ভুলিয়ে রাখার এক অনন্য চেষ্টা ছিল সবার।
শৈলান প্রবীণ নিবাস, যেখানে কেউ গান গেয়ে খুঁজে ফেরেন ফেলে আসা ঐতিহ্যের শিকড়, কেউ প্রিয় নাতনির মুখ দেখার আকুলতা চেপে রাখেন মাটির ঘরের মলিনতায়, আবার কেউ হারানো উঠানের স্মৃতি হাতড়ান একাকী নিস্তব্ধতায়।
নিবাসের একটি ছোট্ট ঘরে থাকেন মমতাজ বেগম। তিনি একজন শিল্পী। তাঁর রক্তে বইছে উচ্চাঙ্গসংগীতের ধারা। সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ ও তাঁর বড় ভাই আফতাবউদ্দিন খাঁ মমতাজ বেগমের দাদা গুল মুহম্মদ খানের কাছে সংগীতের পাঠ নিয়েছিলেন, সেই পরিবারের উত্তরসূরি তিনি। আট বছর আগে নিজেই ইউটিউব ঘেঁটে এই ঠিকানায় চলে আসেন।
স্বামী গত হয়েছেন ২১ বছর আগে। পাঁচ ভাইয়ের একমাত্র বোন মমতাজ বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার বাবা যাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা আজ জানতেও চান না আমি কোথায় আছি, কেমন আছি, কী করছি।’ একাকিত্বের মাঝেও মমতাজ বেগম গান ছাড়েননি, বরং গানকেই আপন করে নিয়েছেন। শূন্য ঘরে একাকী গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন—‘খুঁজবে আমায় সেদিন, যেদিন আমি থাকব না...’
কথা হয় এক বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে, যাঁর ছেলে শহরে বড় চাকরি করেন, সুন্দর সাজানো সংসার। প্রথমবার দাদা হওয়ার খবরে বুকটা আনন্দে ভরে উঠলেও নাতনিকে দেখার সুযোগ হয়নি তাঁর। ধরা গলায় বলেন, ‘নাতিডারে দেখবার বড় ইচ্ছা হইছিল, কিন্তু যাইবার সাহস হয় নাই। যদি আমার পায়ের ধুলায় ছেলের সাদা পরিষ্কার ঘর নোংরা হইয়া যায়!’ এই ভয় আর আভিজাত্যের দূরত্ব তাঁকে আটকে রেখেছে বৃদ্ধাশ্রমের বিছানায়।
গাজীপুরের রহিমা বেগমের গল্পটা আবার ভিটেমাটি হারানোর। একসময় আম-কাঁঠালের বাগান আর বড় উঠানভরা সংসার ছিল তাঁর। স্বামী মারা যাওয়ার পর আত্মীয়স্বজনের অবহেলায় নিঃস্ব হয়ে ঠাঁই নিয়েছেন এই নিবাসে। রাতে ঘুমানোর সময় আজও তাঁর চোখে ভাসে গাজীপুরের সেই হারানো পুকুর আর ধান শুকানোর উঠান।
ইফতারের আগে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশেষ পাঠচক্র। কবি, কথাসাহিত্যিক ও লেখক আনিসুল হকের কালজয়ী উপন্যাস ‘মা’ নিয়ে আলোচনা করেন বন্ধুরা। প্রবীণ বাবা–মায়েদের উপস্থিতিতে ‘মা’ বইটির পাঠ এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে।
ঈদ উপলক্ষে প্রবীণদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন শাড়ি, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি ও থ্রি-পিস। বন্ধুসভার বন্ধুরা তাঁদের সঙ্গে ইফতার করেন। ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সভাপতি হাসান মাহমুদ সম্রাট বলেন, ‘আমরা সারা বছর অনেক উৎসব করি; কিন্তু এই মানুষগুলোর মুখে একটু হাসি ফোটানোর তৃপ্তি অন্য সবকিছুর চেয়ে আলাদা। এখানে আমরা কাউকে কিছু দিতে আসিনি, বরং তাঁদের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে অনেক কিছু শিখতে এসেছি। বাবা–মায়েদের এই নিঃসঙ্গতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময়ের চেয়েও বড় সম্পদ হলো আপন মানুষের সান্নিধ্য। বন্ধুসভা সব সময় এভাবেই মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে মানুষের পাশে থাকতে চায়।’
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বন্ধুসভা পরিচালনা পর্ষদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আশফাকুর রহমান, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সহসভাপতি রাজা মান্নান তালুকদার ও মামুন হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক অনিক সরকার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেঘা খেতান, সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর হাসান, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক জাকিয়া লিমা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক আফিয়া ইবনাত, অর্থ সম্পাদক আতিকুর রহমান, প্রশিক্ষণ সম্পাদক আকিফ বিন সাঈদ, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক রবিউল ইসলাম, কার্যনির্বাহী সদস্য মৌরি বিনতে আযাদসহ অন্য বন্ধুরা।
সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা