আন্তর্জাতিক যুব দিবস
আগামীর বাংলাদেশ: তারুণ্যের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্যানেল আলোচনার আয়োজন করে প্রথম আলো বন্ধুসভা। ‘আগামীর বাংলাদেশ: তারুণ্যের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শিরোনামে ১৩ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহযোগিতা করে ব্র্যাক।
• সাফি রহমান খান
শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক, ব্র্যাক
বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস), বড় আইএনজিও (আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা) বা বিদেশে যাওয়াকে তরুণেরা সম্মানজনক পেশা মনে করলেও কৃষি, উদ্যোক্তা হওয়া বা কারিগরি শিক্ষাকে এখনো সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। তরুণদের দ্রুত ফল পাওয়ার প্রবণতা একদিকে উদ্যোক্তা তৈরির চালিকাশক্তি হলেও ঘন ঘন কাজ বা পেশা বদলের কারণে গভীর দক্ষতা তৈরি না হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে একটি তরুণ রাষ্ট্র। তাই অন্য উন্নত দেশগুলোর মতো এই রূপান্তরের জন্য কিছুটা ধৈর্য ধরা প্রয়োজন। প্রবীণ প্রজন্মের উচিত তরুণদের এই পরিবর্তন-প্রক্রিয়ায় বাধা না দেওয়া।
• মো. আবদুল কাইয়ুম
হেড অব কমিউনিকেশনস, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ
প্রবীণ প্রজন্মকে তরুণদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের ভাষা নয়; বরং শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্য আচরণের মাধ্যমে সংযোগ তৈরি করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক আন্তপ্রজন্ম যোগাযোগের সুযোগ বাড়ানো গেলে এই ফারাক কমে আসবে।
• রাশেদা রওনক খান
সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আকর্ষণের একটি বড় কারণ চাকরির নিরাপত্তা। দক্ষতা হালনাগাদ না করলেও চাকরি হারানোর ঝুঁকি কম থাকায় তরুণেরা এদিকে আকৃষ্ট হন। বিসিএস–কেন্দ্রিক মানসিকতা একটি ‘স্ক্যাম’।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া কোনো পেশাতেই প্রকৃত নিরাপত্তাবোধ তৈরি সম্ভব নয়।
• ড. ইফতেখারুজ্জামান
নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিটি ইতিবাচক পরিবর্তনে তরুণেরা নেতৃত্ব দিয়েছেন; কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে, বিজয়ের পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সিনিয়রদের (প্রবীণ) হাতে ক্ষমতা চলে গেছে, তরুণদের যেতে হয়েছে ‘ব্যাক সিটে’। দেশের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা তরুণদের পরিবর্তে অন্যরা দখল করে ফেলেছে।
২০২৪ সালের আন্দোলনের শক্তি থেকে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হলেও পুরোনো রাজনৈতিক রীতিই সেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে।
• ফাল্গুনী রেজা
অ্যাডভাইজার (চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ুথ লিডারশিপ), প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
আমরা এনজিও বা উন্নয়ন খাতে নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করি; কিন্তু এটা তো শুধু এনজিও বা উন্নয়ন খাত একা করতে পারবে না। কোনো তরুণী যখন বাড়িতে থাকছে, ওখানে সে ভালো আছে কি না; যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, সেখানে নিরাপদ পরিবেশ পাচ্ছে কি না; কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকার, সমান প্লাটফর্ম পাচ্ছে কি না, এই জায়গাগুলো নিয়ে অনেক দিন ধরে কথা হচ্ছে এবং কাজও হচ্ছে অনেক। তবে আমরা এখনো তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি।
অনেক সময় আমাদের নিজেদের ঘর নিরাপদ নয়; পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিরাপদ নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ নয়; কাজের ক্ষেত্রেও অনেক ধরনের ইস্যু আছে, বিশেষ করে সব কর্মক্ষেত্র নারীর জন্য নিরাপদ নয়। এই বিষয়টি একটি বড় কনসার্ন। যারা ডিসিশন মেকিংয়ে আছে সেখানে তারা যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে, সেগুলো যাতে নারীবান্ধব হয়।
• মো. আবদুল কাদির
ব্যবস্থাপক, ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম ও মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম, ব্র্যাক
বাংলাদেশের যেকোনো পরিবর্তনই আসলে তরুণদের হাত ধরে হয়েছে; কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে এই তরুণেরাই যখন সিনিয়র সিটিজেন হয়, তখন তারা পরবর্তী জেনারেশনের পালসটা বুঝতে পারে না।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখের মতো মানুষ বিদেশে যান এবং ফিরে আসার ইচ্ছা নিয়েই তাঁরা সেখানে যান। যাঁরা উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছেন, তাঁদের সংখ্যাটা খুব বেশি না; কিন্তু বাকি মানুষেরা কারা আসলে? এসব মানুষের বড় অংশই কিন্তু যান মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানে কিন্তু সিটিজেনশিপ পাওয়ার সুযোগ নেই। জীবনের যেকোনো সময় তাঁদের ফেরত আসতেই হবে। এই ফেরত আসার প্রক্রিয়া এবং ফেরত আসার পরের যে ঘটনাগুলো ঘটে, সেগুলো আমাদের জন্য খুব বেশি সুখকর না। আমরা শুধু রেমিট্যান্সের কথা বলি। কস্ট অব মাইগ্রেশনের কথা খুব একটা বলি না। কনসার্নের জায়গা হচ্ছে, যারা এখান থেকে দক্ষ না হয়ে বিদেশে যাচ্ছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিন্তু তাঁরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
• বুলবুল হাসান
সভাপতি, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে বিতর্কটা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। তখন বিতর্কের একটা মুভমেন্ট ছিল। একটা লক্ষ্য ছিল। বিতর্কটা শুধু ট্রফি জেতার জন্য নয়। বিতর্কের ভেতর দিয়ে ভিন্নমতের একটা জায়গা তৈরি হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত দশকগুলোতে বিতর্কের যে আদর্শিক জায়গা আছে সেটি থেকে তরুণেরা অনেকটা সরে এসেছেন।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বলতে হয়, এই দেশে তো মিডিয়া ডেভেলপ করল না। মিডিয়াটা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়ায়নি। একটা ইন্ডাস্ট্রি যখন দাঁড়াতে পারে না এবং একজন তরুণ যখন স্বপ্ন নিয়ে সাংবাদিকতায় আসেন, আপনি তাঁর হতাশাটা চিন্তা করতে পারেন? ভয়ংকর লেভেলের হতাশা। কারণ, এটা একটি সৃজনশীল ইন্ডাস্ট্রি। এখানে আপনারা সৃজনশীলতা ও সাহসী সাংবাদিকতার কথা বলেন; কিন্তু সাহসী কথাটা তো লিখতে পারছেন না, রিপোর্ট করতে পারছেন না। এখানে রাষ্ট্র একটা ফ্যাক্টর, সমাজ একটা ফ্যাক্টর, ধর্ম কখনো কখনো চেপে বসে। এমন অসংখ্য বিষয় রয়েছে।
• বেনজির আবরার
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, এক্সিলেন্স বাংলাদেশ
বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে প্রশ্ন করার একটি সাহস হয়েছে। যেটি আগে অনেক সময় শিখিয়ে দেওয়া লাগত, বলে দেওয়া লাগত। একই সঙ্গে যাঁরা সিনিয়র আছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতাও আমাদের জন্য বিশাল ব্যাপার। তাঁদের যে অভিজ্ঞতা, সেটির সঙ্গে তরুণদের কথা বলার শক্তি—দুটি মিলে যদি আমরা একটি কমন জায়গায় আনতে পারি, এটিকে একটি বিষয়ে পরিণত করা সম্ভব।
• শওকত হোসেন
হেড অব অনলাইন, প্রথম আলো
কর্মক্ষেত্রে অনেক পদ ফাঁকা রয়েছে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন কর্মী চাইছে, তেমন দক্ষ কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। তরুণদের মধ্যে নির্দিষ্ট কাজের জন্য, পদের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব রয়েছে। এই বিষয়টা বড় চ্যালেঞ্জ। তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন প্রথম আলো বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক, নির্বাহী সভাপতি ফরহাদ হোসেন মল্লিক ও সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে বন্ধুসভার এই আয়োজনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, বিগত বছরগুলোতে শুধু তরুণদের জন্য বন্ধুসভা কী কী উদ্যোগ নিয়েছে, তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে কী কী কাজ করছে এবং বন্ধুসভার সার্বিক কাজের কথা। পাশাপাশি সব সময় বন্ধুসভার পাশে থাকার জন্য উপস্থিত অতিথি ও আলোচকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান তাঁরা। ধন্যবাদ দেন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ব্র্যাককে।
প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের বিতর্ক ও অনুষ্ঠান সম্পাদক কামরুল ইসলাম।