বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও কথাসাহিত্যিক আনোয়ার পাশা রচিত ‘রাইফেল, রোটি, আওরাত’ অন্যতম। ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত সেই সময়, মানুষের আতঙ্ক, যুদ্ধের বিভীষিকা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই এই উপন্যাসে গভীর বাস্তবতায় ফুটে উঠেছে। এটি শুধু একটি গল্প–কাহিনি নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির জীবনসংগ্রাম, বেদনা ও প্রতিরোধের এক জীবন্ত দলিল।
বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত করতে বই পড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্যে ১৩ মে নগরীর নেভি অ্যাংকরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা। হিরন্ময় কথকতা সিরিজ পাঠচক্রের ২৯তম এই আসরের আলোচ্য বিষয় ছিল কথাসাহিত্যিক ও শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশা রচিত ‘রাইফেল, রোটি, আওরাত’।
পাঠচক্রে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সহসভাপতি নুরুজ্জামান খান। তিনি বলেন, উপন্যাসটির প্রতিটি অধ্যায়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত জনজীবনের অসহায় চিত্র যেমন উঠে এসেছে, তেমনি প্রকাশ পেয়েছে মানুষের ভেতরের সাহস ও মুক্তির স্বপ্নও। ‘রাইফেল’ এখানে দখলদার শক্তির নিষ্ঠুরতার প্রতীক, ‘রোটি’ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি এবং ‘আওরাত’ যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতায় নারীর অসহায় অবস্থানের গভীর ইঙ্গিত বহন করে।
এ তিনটি শব্দ যেন পুরো মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ সময়কে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লেখক নিজেই ছিলেন সেই সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তাই তাঁর ভাষা কৃত্রিম নয়; বরং অনুভব ও অভিজ্ঞতার গভীরতা থেকে উঠে এসেছে। সহজ অথচ শক্তিশালী বর্ণনায় তিনি তুলে ধরেছেন একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও যুদ্ধের নির্মম সত্য।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুদীপ্ত শাহীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন অধ্যাপক। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়েই অবরুদ্ধ ঢাকার ভয়াবহতা, মানুষের আতঙ্ক, যুদ্ধের বিভীষিকা ও একটি জাতির অস্তিত্বসংকট ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে ফিরোজ চরিত্রের মধ্যে তরুণ সমাজের ক্ষোভ, অস্থিরতা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। ফিরোজের স্ত্রী মিনাক্ষী যুদ্ধের সময় এক বাঙালি নারীর আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীন জীবনের প্রতীক হিসেবে উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ জন্যই ‘রাইফেল, রোটি, আওরাত’ শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধারণ করা এক অনন্য সৃষ্টি।
পাঠচক্রের আয়োজন সম্পর্কে চট্টগ্রাম নেভি অ্যাংকরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল কমান্ডার জাকারিয়া পারভেজ (ইডিএন) বিএন বলেন, ‘একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে গেলে বই পড়া খুব প্রয়োজন। এই প্রতিষ্ঠানে সৃজনশীল কার্যক্রমগুলোর যেমন প্ল্যাটফর্ম আছে, তেমনি বই পড়ার জন্য বিশাল এক লাইব্রেরি রয়েছে। আমি চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা বই পড়ার মাধ্যমে নিজেদের একজন ভালো মানুষ হিসেবে তৈরি করবে। আজকের এ আয়োজনে চট্টগ্রাম বন্ধুসভার পাঠচক্র আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে। তাঁদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা।’
চট্টগ্রাম বন্ধুসভাকে ধন্যবাদ জানিয়ে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক তৌহিদুজ্জামান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্ধুসভার কার্যক্রমগুলো আমার বেশ ভালো লাগে। তরুণদের নিয়ে সৃজনশীল আয়োজন, যেমন পাঠচক্র, বিজ্ঞান উৎসবসহ অন্যান্য কার্যক্রমে তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রশংসনীয়। শিক্ষার্থীদের জন্য আজকের আয়োজনে তাঁদের সহযোগিতা করতে পেরে আমরা আনন্দিত।’
পাঠচক্র সঞ্চালনা করেন পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক কামরান চৌধুরী। এ ছাড়া তিনি পাঠচক্র শুরুর আগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম আলো বন্ধুসভা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাঠচক্রে আরও উপস্থিত ছিলেন দপ্তর সম্পাদক জয় চক্রবর্ত্তী ও সহসমন্বয়কারী তাফসিরুল ইসলাম। পাঠচক্র শেষে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়ীদের পুরস্কার হিসেবে কিশোর আলো এবং উপস্থিত সব শিক্ষার্থীকে চকলেট ও বুকমার্ক প্রদান করা হয়।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা