চট্টগ্রাম বন্ধুসভার কক্ষে গত ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছে হিরন্ময় কথকতা সিরিজ পাঠচক্রের ৩৬তম পর্ব। এবারের আলোচ্য বই ছিল রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত উপন্যাস ‘মাল্যবান’। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি রুমিলা বড়ুয়া।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত ‘মাল্যবান’ একটি ব্যতিক্রমধর্মী মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। ১৯৪৮ সালে রচিত উপন্যাসটি কবির মৃত্যুর পর ১৯৭০ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রচলিত কাহিনিনির্ভর উপন্যাসের বাইরে গিয়ে এখানে লেখক মানুষের অন্তর্জগৎ, আবেগ, নিঃসঙ্গতা, দাম্পত্যের টানাপোড়েন ও ব্যক্তিসত্তার সংঘাতকে তুলে ধরেছেন।
রুমিলা বড়ুয়া বলেন, ‘উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাল্যবান ও তার স্ত্রী উৎপলা। তাদের দাম্পত্য জীবনে একসঙ্গে বসবাস থাকলেও মানসিক নৈকট্যের অভাব স্পষ্ট। স্বামী–স্ত্রীর প্রত্যাশা, অনুভূতি ও জীবনবোধের পার্থক্য তাদের সম্পর্ককে ক্রমেই জটিল করে তোলে। মাল্যবানের কাছে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও পারিবারিক বন্ধন গুরুত্বপূর্ণ হলেও উৎপলার সঙ্গে তার আবেগের দূরত্ব তাকে প্রতিনিয়ত একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেয়। আমার পাঠানুভূতিতে মাল্যবান এমন একজন মানুষ, যে ভালোবাসতে জানে, কিন্তু নিজের ভালোবাসার যথাযথ প্রতিদান পায় না। স্ত্রীর অবহেলা ও দূরত্ব অনুভব করেও সে সম্পর্কের ভেতর নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চায়। তার নীরবতা, অভিমান, আত্মসংযম ও সংসারজীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা চরিত্রটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে।’
অন্যদিকে উৎপলাকে কেবল অবহেলাকারী স্ত্রী হিসেবে দেখলে চরিত্রটির পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বোঝা সম্ভব নয়। তার নিজস্ব ব্যক্তিসত্তা, আকাঙ্ক্ষা ও আচরণও উপন্যাসের সম্পর্কের সমীকরণকে প্রভাবিত করে। উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, মাল্যবানের চরিত্রে লেখক নিজের অন্তর্জগতের কিছু অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার ছায়া তুলে ধরেছেন। তবে চরিত্রটিকে সরাসরি লেখকের প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কখনো নীরবতা হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা, কখনো ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে অভিমানে, আবার কখনো একই ছাদের নিচে থেকেও দুজন মানুষের দূরত্ব প্রকট হয়ে উঠেছে।
রুমিলা বড়ুয়া বলেন, ‘আমার কাছে উপন্যাসটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা। প্রায় আট দশক আগে এটি রচিত হলেও দাম্পত্যে অবহেলা, পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, ভালোবাসার অপূর্ণতা এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতার যে চিত্র জীবনানন্দ এঁকেছেন, তার সঙ্গে আজকের আধুনিক সংসারজীবনের অনেক বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দিন শেষে “মাল্যবান” আমাকে একটি বিষয় নতুন করে ভাবিয়েছে; একই সংসারে পাশাপাশি বসবাস করলেই দুজন মানুষ পরস্পরের আপন হয়ে ওঠে না। কখনো কখনো সবচেয়ে কাছের সম্পর্কের মধ্যেই মানুষের সবচেয়ে দীর্ঘ নিঃসঙ্গতার জন্ম হয়।’
বইটি পড়ার অনুভূতি জানিয়ে বন্ধু ইষ্টি পাল বলেন, ‘লেখকের নানা গল্প–কবিতা আমাদের উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যবই ছিল। ওনার প্রতিটি কথার পেছনে মিশে আছে বাস্তবিক মায়া, অবহেলার বিষয়বস্তু। আজ পাঠচক্রে লেখকের “মাল্যবান” বইটি নিয়ে আলোচনা শুনে নানা রহস্যঘেরা বাক্য, স্বার্থ ত্যাগসহ আরও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে পেরেছি।’
পাঠচক্র শেষে বন্ধুদের নিয়ে কুইজ অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে কম সময়ে সঠিক উত্তর দিয়ে বিজয়ী হয়েছেন বন্ধু প্রত্যয় পাল।
পাঠচক্রের সমন্বয়কারী হিসেবে ছিলেন পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক কামরান চৌধুরী, তাফসিরুল ইসলাম ও তিশমা দাশ। এতে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক আফিফ ইব্রাহীম, কার্যনির্বাহী সদস্য মারুফ উল হক, বন্ধু ইষ্টি পাল, সাকিবুল ইনামসহ অন্য বন্ধুরা।
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা