পদ্মা নদীর মান-অভিমানের সঙ্গে মাঝি কুবেরের জীবনের নানা সমীকরণকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একসুতায় বেঁধে দিয়েছেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে। ১৯ মে ছিল এই কথাসাহিত্যিকের জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস নিয়ে ভার্চ্যুয়ালি পাঠচক্রের আসর করেছে সিলেট বন্ধুসভা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ সালের ১৯ মে বিহারের (বর্তমানে ঝাড়খন্ড রাজ্যের) সাঁওতাল পরগনার দুমকা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও নীরোদাসুন্দরী দেবীর অষ্টম সন্তান। পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। পিতার বদলির সুবাদে ছোটবেলা থেকেই নানা জনপদ, নানা সত্ত্বার জীবনের সংস্পর্শে আসেন মানিক। এসবই ফুটে উঠেছে তাঁর সৃষ্টিগুলোয়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক জীবনে প্রবেশটা বেশ বিচিত্র। ক্যানটিনে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে লিখে ফেলেন প্রথম গল্প ‘অতসী মামি’, যা বিচিত্রা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি মার্ক্সের মতবাদ দ্বারা বেশ প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর রচনাগুলোয় ফুটে ওঠে শ্রমিকশ্রেণির জীবনসংগ্রাম। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসটিও এর ব্যতিক্রম নয়। নীরোদাসুন্দরী দেবীর আদি নিবাস ছিল ঢাকার বিক্রমপুরের গাউদিয়া গ্রামে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসটি গাউদিয়া গ্রামের পটভূমিতে রচিত।
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে গুটিকয়েক মানুষ থাকলেও এটি পদ্মাপাড়ের সব মানুষের জীবনের এক লিপিবদ্ধ জীবনচিত্র। শহুরে বড় বড় বিলবোর্ড আর কংক্রিটের জীবনে সীমাবদ্ধ মানুষদের কাছে এ এক নতুন জীবনের ধারণা তুলে ধরে। শিল্পীর মতো সুনিপুণ হাতের কারসাজিতে লেখক পদ্মা নদীকেন্দ্রিক জীবনকে এঁকে দিয়েছেন শহুরে জীবনের চিত্তে। পদ্মাপাড়ের মানুষের আনন্দ, প্রেম, সংগ্রাম, শিল্প, সত্ত্বা সব আবর্তিত হয় নদীকে ঘিরে।
উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে কুবের, মালা, কপিলা ও হোসেন মিয়া। আরও সুনির্দিষ্ট করলে গল্পটি কুবেরের মাধ্যমেই আবর্তিত হয়। কুবের পেশায় মাঝি হলেও মূলত সে পরিশ্রমী-সংগ্রামী মানুষের প্রতীক। যার নিয়তিও নদীর সঙ্গেই কেন্দ্রীভূত। তার স্ত্রী মালা চলাফেরায় অক্ষম। তার মধ্যেও সাধারণ গ্রাম্যবধূর মতোই শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে সংসার টিকিয়ে রাখার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে। কিন্তু দারিদ্য আর অভাব-অনটনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিতলেও তার বোন কপিলার সঙ্গে স্বামী কুবেরের উষ্ণ সম্পর্কের আঁচ পরিবারে এক নতুন সমীকরণ দাঁড় করায়।
পাঠচক্র পর্যালোচনায় বন্ধু প্রণব চৌধুরী বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো এক জায়গার জীবন ও জীবনবোধ দুটোরই পরিবর্তন হয়। লেখক তৎকালীন সময়, সমাজ ব্যবস্থা ও জীবনবোধের এক অপূর্ব মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছেন।
বন্ধু শুভ তালুকদার বলেন, লেখক শ্রমিক-সংগ্রামী জীবনের প্রতি অনেকটাই সংবেদনশীল ছিলেন, যা তাঁর অন্যান্য রচনায়ও স্পষ্টত দৃশ্যমান। তাও তিনি কুবেরকে দোষত্রুটি উপেক্ষা করে চরিত্রায়ন করেননি। বরং কপিলার প্রভাবে তার নৈতিক দূর্বলতাকেও উপস্থাপন করেছেন।
পাঠচক্রে আরও যুক্ত ছিলেন বন্ধু ফয়সাল আহমেদ, গায়েত্রী বৃষ্টি, সুবর্ণা দেব, সমরজিত হালদার, অনুপমা দাস, সৌম্য মন্ডল, মিনথিয়া রহমান, প্রাণেশ দাস, অমিত দেবনাথ, জামিউল আরাফসহ অন্য বন্ধুরা।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, সিলেট বন্ধুসভা